রাজধানীর লালবাগে বালুঘাট ঢাল থেকে সাত শহীদ কমিউনিটি সেন্টার পর্যন্ত জেএন সাহা রোডের দুই পাশের সড়ক ও ড্রেন সংস্কারকাজে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা বরাদ্দের এ প্রকল্পে ড্রেনের তলদেশে নির্ধারিত তিন ইঞ্চির পরিবর্তে কোথাও মাত্র এক ইঞ্চি সিসি ঢালাই, ২৪ ইঞ্চির পরিবর্তে ২১ ইঞ্চি গাঁথনি, পুরোনো ইট ব্যবহার এবং ড্রেনের পানি প্রবাহিত রেখেই ঢালাই দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অভিযোগের পর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অঞ্চল-৩-এর এক প্রকৌশলী নিয়ম মেনে কাজ করার আশ্বাস দিলেও সরেজমিনে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি বলে দাবি স্থানীয়দের। পরে আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ত্রুটিপূর্ণ কাজ ভেঙে পুনরায় নির্মাণের নির্দেশ দেন। তবে সেই নির্দেশও উপেক্ষা করে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, লালবাগ থানা এলাকার জেএন সাহা রোডের দুই পাশে ৪০০ মিটার করে মোট ৮০০ মিটার সড়ক ও ড্রেন সংস্কার করা হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ এ সড়ক দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যানবাহন চলাচল করে। বেড়িবাঁধ থেকে বালুঘাট ঢাল হয়ে লালবাগ ও নবাবগঞ্জে যাতায়াতের অন্যতম পথ এটি। ফলে নির্মাণকাজে ত্রুটি থাকলে সড়ক ও ড্রেনের স্থায়িত্ব নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির মালিক পরিচয় দেওয়া দুলাল দাস প্রথমে যুগান্তরকে বলেন, প্রাক্কলনে ড্রেনের তলদেশে তিন ইঞ্চি ঢালাইয়ের কথা থাকলেও তারা দুই ইঞ্চি দিয়েছেন। গাঁথনির উচ্চতা ২৪ ইঞ্চির পরিবর্তে ২১ ইঞ্চি রাখা হয়েছে। ২০২২ সালে দরপত্র আহ্বান করা হলেও তারা কাজটি পেয়েছেন ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে। এ সময়ে নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ায় কিছুটা কম উপকরণ ব্যবহারের কথা জানান তিনি।
তবে সরেজমিনে শ্রমিক দিয়ে মেপে ড্রেনের তলদেশের সিসি ঢালাইয়ের পুরুত্ব পাওয়া যায় মাত্র এক ইঞ্চি। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিম্নমানের ইট ব্যবহারের পাশাপাশি কোথাও সিমেন্টের পরিবর্তে বালু ব্যবহারের ঘটনাও ঘটছে। ড্রেনের ময়লা পানি সরিয়ে নিতে সাময়িক বিকল্প লাইন তৈরি না করেই আগের লাইন দিয়ে পানি প্রবাহিত অবস্থায় ঢালাই দেওয়া হচ্ছে।
পুরোনো ইট ব্যবহারের বিষয়ে দুলাল দাস যুগান্তরকে বলেন, তাদের কাগজপত্রে পুরোনো ইট ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে। তবে অভিযোগের বিষয়ে কথা বলার একপর্যায়ে তিনি প্রতিবেদককে আপাতত ১০ হাজার টাকা রাখতে বলেন। পরে কাজ শেষ হলে আবার সম্মানী দেওয়ার কথাও বলেন তিনি।
এ বিষয়ে ডিএসসিসির অঞ্চল-৩-এর প্রকৌশলী আহসান হাবীব যুগান্তরকে বলেন, অভিযোগের পর পুরোনো ইট পরিবর্তন এবং বিকল্প ড্রেনেজ লাইন তৈরি করে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তাঁর দাবি, পুরোনো ইট সরিয়ে নতুন ইট বসানো হয়েছে এবং ডাইভারশন পাইপের মাধ্যমে পানি প্রবাহ সচল রেখে নতুন করে সিসি ঢালাই করা হয়েছে। এ দাবির পক্ষে তিনি পাইপ বসানোর একটি ছবি পাঠান। তবে প্রতিবেদক ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই পাইপের অস্তিত্ব পাননি। ফলে প্রকৌশলীর বক্তব্যের সঙ্গে সরেজমিনের চিত্রে অমিল দেখা যায়।
আহসান হাবীব আরও বলেন, প্রতিটি প্রাক্কলনে স্যালভেজ হিসেবে চার থেকে পাঁচ হাজার পুরোনো ইট ধরা থাকে, যা ঠিকাদাররা সাধারণত ড্রেনের সলিংয়ে ব্যবহার করেন। এ কারণে নতুন ইটের মূল্য বাবদ বিল থেকে টাকা কেটে নেওয়া হয়।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজ সম্পন্নের কথা বলা হলেও পুরোনো ইটের যথাযথ ব্যবহার, নির্মাণের মান এবং বিকল্প পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়নি। বরং এসব ক্ষেত্রে অনিয়মের চিত্র দেখা গেছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগের পর গত ১৬ অক্টোবর শুক্রবার দুপুরে অঞ্চল-৩-এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপসচিব আক্তার উননেছা শিউলী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ সময় স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি ২৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি নেতা হাফেজ খোকন, ২৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীর আলমসহ স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা উপস্থিত ছিলেন।
পরিদর্শনের সময় অভিযোগ ও প্রমাণের ভিত্তিতে ইতোমধ্যে সম্পন্ন হওয়া ত্রুটিপূর্ণ কাজ প্রয়োজন অনুযায়ী ভেঙে পুনরায় নির্মাণের নির্দেশ দেন আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা। একই সঙ্গে ড্রেনের ঢালাইয়ের সময় ময়লা পানির প্রবাহ সচল রাখতে বিকল্প ডাইভারশন লাইন স্থাপন এবং প্রাক্কলন অনুযায়ী গাঁথনির উচ্চতা ও তলদেশের সিসি ঢালাই নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেন তিনি।
আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা আক্তার উননেছা শিউলী যুগান্তরকে বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশনা দেওয়ার পরও তা না মেনে আগের নিয়মে কাজ করা হচ্ছে। যেসব কাজ ভেঙে সঠিক নিয়মে পুনরায় করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোও করা হয়নি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পরে দুলাল দাসের সঙ্গে আবার কথা হলে তিনি দাবি করেন, নির্বাহী কর্মকর্তা পরিদর্শনের পর ত্রুটিপূর্ণ কাজ সংশোধন করা হয়েছে। প্রথমবার কাজের সময় তিনি নিজে উপস্থিত ছিলেন না বলে কিছু অনিয়ম হয়েছে। সেগুলো সংশোধন করে নির্দেশনা অনুযায়ী নতুন করে কাজ করা হচ্ছে। সড়কের উচ্চতা অসমান হওয়ায় কোথাও ৩০ ইঞ্চি, কোথাও ২০ ইঞ্চি, আবার কোথাও ২৪ ইঞ্চি দিতে হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা রোকন উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ এ সড়কে শুরু থেকেই ড্রেনের ময়লা পানির জন্য বিকল্প লাইন তৈরি না করেই কাজ করা হচ্ছে। এলাকাবাসী একাধিকবার আপত্তি জানালেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তা আমলে নেয়নি। নির্বাহী কর্মকর্তা অনিয়মের প্রমাণ পেয়ে কাজ ভেঙে পুনরায় করার নির্দেশ দিলেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি বলে অভিযোগ তাঁর।
নিম্নমানের কাজের কারণে ভবিষ্যতে সড়ক বা ড্রেন নষ্ট হলে তা জনভোগান্তি আরও বাড়াবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন রোকন উদ্দিন। এ জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তদারকি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বাসিন্দা বলেন, সড়ক ও ড্রেন সংস্কারকাজে বারবার অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। কারিগরি জ্ঞান না থাকায় অনেক সময় তাঁরা প্রতিবাদও করতে পারেন না। তাঁদের আশঙ্কা, উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম চলতে থাকলে সাধারণ মানুষ প্রত্যাশিত সুফল থেকে বঞ্চিত হবেন। তাই অনিয়ম বন্ধ, প্রকল্পের অর্থের যথাযথ ব্যবহার এবং নির্মাণের মান নিশ্চিত করতে কঠোর তদারকি, তদন্ত ও দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানান তাঁরা।
নির্ধারিত প্রাক্কলন অনুযায়ী কাজ নিশ্চিত করা এবং ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণ সংশোধনের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশের পরও অনিয়মের অভিযোগ অব্যাহত থাকায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকার এ প্রকল্পের নির্মাণমান, তদারকি এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।