গ্রামের পরিচিত একটি দৃশ্য—টাকার প্রয়োজন, কিন্তু হাতে নগদ নেই। তখন নিজের জমিই হয়ে ওঠে ভরসা। কারও কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে জমি বন্ধক রাখা হলো। শর্ত, টাকা ফেরত না দেওয়া পর্যন্ত সেই জমি চাষ করবেন ঋণদাতা। জমিতে ফলবে ধান, গম কিংবা অন্য কোনো ফসল। প্রশ্ন হলো, সেই ফসলের মালিক কে?
ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে এ প্রশ্নের গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক রয়েছে। ইসলামী চিন্তাবিদ ও আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, ঋণের নিশ্চয়তা হিসেবে কোনো সম্পদ বন্ধক রাখা ইসলামে বৈধ। প্রয়োজনের সময় একজন ব্যক্তি টাকা ধার নিয়ে তার জমি বা অন্য কোনো সম্পদ বন্ধক রাখতে পারেন।
কোরআনের সূরা আল-বাকারার ২৮৩ নম্বর আয়াতে বন্ধকের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। হাদিসেও মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বর্ম বন্ধক রাখার ঘটনা পাওয়া যায়। তবে বন্ধক রাখার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
শায়খ আহমাদুল্লাহর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ঋণের বিনিময়ে বন্ধক রাখা সম্পদ থেকে ঋণদাতা অতিরিক্ত কোনো সুবিধা নিতে পারবেন না। ফলে জমি বন্ধক রেখে টাকা দেওয়ার পর সেই জমি নিজের দখলে নিয়ে চাষ করা এবং উৎপাদিত ফসল ভোগ করা শরিয়তসম্মত নয়।
ধরা যাক, একজন ব্যক্তি ৫ লাখ টাকা ধার নিলেন এবং এর বিপরীতে ২ বিঘা জমি বন্ধক রাখলেন। ঋণদাতা সেই জমি চাষ করে প্রতি বছর উৎপাদিত ফসল নিজের কাছে রাখছেন। ঋণ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত এভাবে জমির সুবিধা ভোগ করছেন।
বাহ্যিকভাবে এটি স্বাভাবিক লেনদেন মনে হলেও ইসলামী বিধানের আলোচনায় এখানে মূল প্রশ্ন হলো—ঋণের কারণে ঋণদাতা যে বাড়তি সুবিধা পেলেন, সেটি কীভাবে পেলেন। ঋণদাতা মূলত তার দেওয়া টাকা ফেরত পাওয়ার অধিকারী। এর বাইরে ঋণের কারণে কোনো অতিরিক্ত সুবিধা নেওয়া হলে তা সুদের পর্যায়ে পড়তে পারে বলে আলেমরা ব্যাখ্যা করেন।
জমির মালিক নিজে সম্মতি দিলেও এ ধরনের সুবিধা গ্রহণ বৈধ হয়ে যায় না বলে শায়খ আহমাদুল্লাহর ব্যাখ্যায় উঠে এসেছে। কারণ, ঋণের সঙ্গে যদি জমি ভোগের সুবিধা যুক্ত থাকে, তাহলে সেখানে ঋণের বিনিময়ে অতিরিক্ত সুবিধা নেওয়ার বিষয়টি থেকে যায়।
প্রচলিত ব্যবস্থার বিকল্প
জমির মালিক চাইলে ঋণের চুক্তি এবং জমি ব্যবহারের জন্য আলাদা চুক্তি করতে পারেন। অর্থাৎ, ঋণের নিশ্চয়তা হিসেবে জমি বন্ধক থাকবে। আর জমি চাষ করতে হলে আলাদাভাবে ইজারা বা বর্গাচাষের চুক্তি করা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে ন্যায্য ভাড়া বা ফসলের অংশ নির্ধারণ করতে হবে।
তবে জমি ব্যবহারের বিষয়টি ঋণের শর্ত হিসেবে রাখা যাবে না। অর্থাৎ, জমি বন্ধক রাখা বৈধ হলেও ঋণের বিনিময়ে সেই জমির ফসল ভোগ করা বৈধ নয়।
টাকার প্রয়োজন মেটাতে জমি বন্ধক রাখা তাই নিজে সমস্যা নয়। সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন ঋণের সঙ্গে জমির ভোগ বা লাভের সুবিধা যুক্ত করা হয়। ইসলামী শরিয়তের এই মূলনীতিতে ঋণকে সহযোগিতার মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়েছে; ঋণের বিনিময়ে অতিরিক্ত সুবিধা নেওয়াকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।