রাজধানীর ইসিবি চত্বরের নিউগিনি আবাসন প্রকল্পে হামলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল একটি খাবারের দোকানে বসে। জমি ও চলাচলের রাস্তা নিয়ে বিরোধের জেরে ওই পরিকল্পনা করা হয় বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। পরে মিরপুরের দুটি ‘সন্ত্রাসী বাহিনী’ থেকে লোক জোগাড় করে রাতে সশস্ত্র হামলা চালানো হয় বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রথম আলো জানিয়েছে, গত ২৬ সেপ্টেম্বর হামলার দিন দুপুরে ইসিবি চত্বরের একটি খাবারের দোকানে বৈঠক হয়। বিকেলে ভাষানটেকের দেওয়ানপাড়া ও মানিকদী এলাকায় দুই দলে লোক জড়ো করা হয়। পরে আগ্নেয়াস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে পাঁচটি পিকআপে এবং হেঁটে প্রায় ২০০ জন নিউগিনি আবাসন প্রকল্পে যায়। রাত সাড়ে ১০টার দিকে মূল ফটকে গুলি ছুড়ে হামলা শুরু হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, হামলায় ভাষানটেক থানা বিএনপির আহ্বায়ক মো. ইব্রাহিম ও পল্লবীর মফিজুর রহমান মামুনের বাহিনীর সদস্যরা অংশ নেন। পুলিশের তালিকায় ইব্রাহিমের নাম ‘কিলার ইব্রাহিম’ হিসেবে রয়েছে। হামলাকারীদের মধ্যে ইব্রাহিমের অনুসারীর সংখ্যা বেশি ছিল বলে সূত্রের দাবি। দুই বাহিনী থেকে লোক জোগাড়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ঠিকাদার বিকাশ চন্দ্র শাহকে।
হামলার সময় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতেও ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়। ওই রাতেই ঘটনার বর্ণনা দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও প্রকাশ করেন তিনি। এরপর ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
এ ঘটনায় করা মামলা বর্তমানে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) গুলশান বিভাগের তদন্তাধীন। এর আগে ক্যান্টনমেন্ট থানা মামলাটির তদন্ত করছিল। এখন পর্যন্ত মেজর জেনারেল (অব.) গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরী, মিজানুর রহমান, শাহরিয়ার মাহমুদ, শাহ আলম, মামুন, আসলাম ও মুন্নাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার সাতজনই রিমান্ডে রয়েছেন। গ্রেপ্তার হওয়া মামুন ও বাহিনীপ্রধান মফিজুর রহমান মামুন আলাদা ব্যক্তি।
ডিবি গুলশান বিভাগের উপকমিশনার আ ফ ম আনোয়ার হোসেন বলেন, জমি নিয়ে বিরোধের জেরে হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলার পরিকল্পনায় কারা জড়িত, কারা অংশ নিয়েছে এবং কারা অস্ত্র সরবরাহ করেছে—এসব বিষয় তদন্ত করা হচ্ছে। কিছু তথ্য পাওয়া গেছে, সেগুলো যাচাই-বাছাই চলছে।
খাবারের দোকানে বৈঠক
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, হামলার দিন দুপুরে ইসিবি চত্বরের একটি খাবারের দোকানে বৈঠক হয়। সিসিটিভি ফুটেজে সেখানে ১৩ জনকে দেখা গেছে। তাঁদের মধ্যে শাহরিয়ার মাহমুদ ও বিকাশ চন্দ্র শাহকে শনাক্ত করা হয়েছে। বাকি ১১ জনকে শনাক্তের চেষ্টা চলছে। হামলার পরিকল্পনায় শাহরিয়ার ও বিকাশ যুক্ত ছিলেন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিভিন্ন আবাসন প্রকল্পে ভবন নির্মাণের কাজ করেন বিকাশ। নিউগিনি আবাসন প্রকল্পের মালিক নাজিম উদ্দিন ভুঁইয়ার সঙ্গে জমি নিয়ে গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ কয়েকজনের বিরোধ ছিল। বিরোধপূর্ণ জমিতে ভবন নির্মাণের কাজ বিকাশকে দেওয়া হয়েছিল।
তদন্তকারীদের দাবি, ভবন নির্মাণের পাশাপাশি নিউগিনির মালিকের সঙ্গে কথা বলে চলাচলের রাস্তার ব্যবস্থা করার কথা ছিল বিকাশের। কিন্তু নাজিম উদ্দিন রাস্তা দিতে রাজি না হওয়ায় বিরোধ তৈরি হয়। ওই বিরোধের সঙ্গে হামলার যোগসূত্র রয়েছে বলে তদন্তকারীরা মনে করছেন।
তবে হামলার পরিকল্পনায় জড়িত থাকা ও লোক জোগাড়ের অভিযোগের বিষয়ে বিকাশ চন্দ্র শাহের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তিনি আত্মগোপনে আছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
দুই বাহিনী থেকে লোক জোগাড়
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, খাবারের দোকানের বৈঠক থেকে হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর বিকাশ চন্দ্র শাহকে লোক জোগাড়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক শাহ আলম অনিকের মাধ্যমে ইব্রাহিম ও মফিজুর রহমান মামুনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন বলে সূত্রের দাবি। পরে দুই বাহিনীর লোকজন হামলায় অংশ নেয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, ঘটনার দিন বিকেল চারটার দিকে ভাষানটেক বস্তি ও পল্লবী এলাকা থেকে লোক এনে দেওয়ানপাড়ার দোতলা মসজিদের সামনের মাঠে জড়ো করা হয়। পরে তাঁদের নিউগিনি আবাসন প্রকল্পের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, হামলাকারীদের বড় একটি অংশ এসেছিল ভাষানটেক বস্তি থেকে। ঘটনাস্থল থেকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার দুজনও ওই এলাকার বাসিন্দা এবং তাঁরা ইব্রাহিমের অনুসারী বলে সূত্রটি জানিয়েছে। হামলায় ইব্রাহিমের অনুসারী যুবরাজ, শাহেদ, শাকিল, রূপচান, বাবলু ও বুকপোড়া সুমনও জড়িত ছিলেন বলে পুলিশের একটি সূত্র দাবি করেছে।
স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, ভাষানটেক এলাকায় ভবন নির্মাণ শুরু হলে ইব্রাহিমের অনুসারীরা সেখানে গিয়ে মাটি ভরাটের কাজ এবং ইট, বালু, সিমেন্টসহ নির্মাণসামগ্রী তাঁদের কাছ থেকে নিতে চাপ দেন। এক ভবনমালিকের অভিযোগ, তাঁদের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় তাঁর নির্মাণাধীন ভবনের সামনে গুলি করা হয়। পরে তিনি ইব্রাহিমের কাছ থেকে নির্মাণসামগ্রী কিনতে বাধ্য হন বলে দাবি করেন।
পুলিশের দাবি, নিউগিনির হামলায় পল্লবীর মফিজুর রহমান মামুনের বাহিনীর সদস্যরাও অংশ নেন। মিরপুর ও আশপাশের এলাকায় জমি দখলে তাঁদের ভাড়াটে হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। মফিজুর রহমান মামুন পল্লবী থানার ৯১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ছিলেন। খুন, জমি দখল ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে গত মঙ্গলবার তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
নিউগিনি আবাসন প্রকল্পের মালিক নাজিম উদ্দিন ভুঁইয়াও হামলায় ইব্রাহিম ও মামুন বাহিনীর লোকজন জড়িত বলে দাবি করেছেন। তবে তাঁদের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের পাওয়া যায়নি।
পুলিশকে লক্ষ্য করেও গুলি
হামলার একপর্যায়ে ছয়জন পুলিশ সদস্য ঘটনাস্থলে গেলে হামলাকারীরা তাঁদের লক্ষ্য করেও গুলি ছোড়ে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে ওই গুলি কারা ছুড়েছিল, তা এখনো শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ।
মামলার এজাহারে হামলার সময় আনুমানিক ৫০টি গুলি ছোড়ার অভিযোগ করা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সদস্যরা পাঁচটি গুলি ছোড়েন।
এদিকে গত বুধবার সালমান মুক্তাদিরের ব্যাংক হিসাব ও লেনদেনের তথ্য চেয়েছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। একটি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে এসব তথ্য চাওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
জমি ও রাস্তা নিয়ে বিরোধ
নাজিম উদ্দিন ভুঁইয়া ২০১১ সাল থেকে ক্যান্টনমেন্ট থানাধীন ইসিবি চত্বর এলাকায় জমি কিনে আবাসন ব্যবসা শুরু করেন। বর্তমানে তাঁর নিউগিনি আবাসন প্রকল্পের আয়তন ১০ থেকে ১২ বিঘা।
তদন্তে প্রকল্পসংলগ্ন ৩৫ কাঠা জমি নিয়ে বিরোধের বিষয়টি উঠে এসেছে। ওই জমির এক পাশে নিউগিনি আবাসন প্রকল্প এবং অন্য পাশে স্থানীয় বাসিন্দাদের ঘরবাড়ি। জমি থেকে বের হওয়ার জন্য নিউগিনি প্রকল্পের রাস্তা ব্যবহারের বিষয়টি নিয়েই বিরোধ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
নাজিম উদ্দিনের দাবি, ৩৫ কাঠার মধ্যে ১৫ কাঠা জমি গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরী তাঁর কাছে বিক্রি করেছিলেন। তিনি সেখানে মাটি ভরাট করে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর হামলা চালিয়ে সেই সীমানাপ্রাচীর ভেঙে দেওয়া হয় বলে তাঁর অভিযোগ।
নাজিমের অভিযোগ, জমি বুঝিয়ে না দিয়ে সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণের ঘোষণা দেন গোলাম মহিউদ্দিন। একই সঙ্গে নিউগিনি আবাসন প্রকল্পের ভেতর দিয়ে রাস্তা দিতে চাপ দেওয়া হয়। রাস্তা দিতে রাজি না হওয়ায় ভাড়াটে লোকজন দিয়ে হামলা করানো হয়েছে বলে তাঁর দাবি।
নাজিমের বিরুদ্ধেও মামলা
নিউগিনি আবাসন প্রকল্পের মালিক নাজিম উদ্দিনের বিরুদ্ধেও জমিসংক্রান্ত মামলা রয়েছে। জোয়ার সাহারা এলাকায় সাড়ে আট কাঠা জমির পুরো দাম পরিশোধ না করে তা অন্যের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগে গত জুলাইয়ে ক্যান্টনমেন্ট থানায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেন মিজানুর রহমান নামের এক ব্যক্তি।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে জমিটি কেনার জন্য বায়নাপত্র করা হয়। জমির দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা। নাজিম উদ্দিন ১ কোটি টাকা পরিশোধ করেন। বাকি ৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা পাঁচ মাসের মধ্যে দেওয়ার কথা থাকলেও তা পরিশোধ না করেই জমিটি অন্যের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয় বলে বাদীর অভিযোগ।
আওয়ামী লীগ আমলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে জমি দখলের অভিযোগ অস্বীকার করে নাজিম উদ্দিন বলেন, ব্যবসায়িক প্রতিপক্ষরা বিভিন্ন সময়ে তাঁকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ‘ট্যাগ’ দিয়ে হয়রানি করেছেন।
তাঁর ভাষ্য, ২০২২ সালে বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বিশেষ ক্ষমতা আইনে ঢাকার বিভিন্ন থানায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়। এসব মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে তিনি কারাগারেও ছিলেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ক্যান্টনমেন্ট থানায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তাঁকে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ আখ্যা দিয়েও মামলা দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
জি বাংলা ডেস্ক