দিনশেষে মানিকগঞ্জের আরেকটি অর্জন। জাতীয় পর্যায়ে ‘গুণী শিক্ষক’ হিসেবে সম্মাননা পেয়েছেন মানিকগঞ্জের শিবালয় সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মো. হাবিবুর রহমান। বিশ্ব শিক্ষক দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে জাতীয় পর্যায়ে ‘গুণী শিক্ষক’ নির্বাচিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছ থেকে সম্মাননা মেডেল ও সনদপত্র গ্রহণ করেন তিনি।
সোমবার (৫ অক্টোবর) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেশের ১০২ জন গুণী শিক্ষককে সম্মাননা দেওয়া হয়। সম্মাননা হিসেবে প্রত্যেক শিক্ষককে ২ লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র দেওয়া হয়।
শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ অবদান, শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ও মানবিক বিকাশে ভূমিকা, পেশাগত দক্ষতা, নিষ্ঠা ও দীর্ঘদিনের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে জেলা, উপজেলা ও জাতীয় পর্যায়ে ‘গুণী শিক্ষক’ নির্বাচিত হয়েছেন হাবিবুর রহমান। তাঁর এই অর্জনে শিবালয় সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও পুরো মানিকগঞ্জ জেলায় আনন্দ ও গর্বের সৃষ্টি হয়েছে।
মো. হাবিবুর রহমানের জন্ম মাগুরা জেলায়। চার ভাই-বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। ছোটবেলা থেকেই শিক্ষকতা পেশার প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। জ্ঞান বিতরণ, শিক্ষার্থীদের মেধা ও মননের বিকাশ এবং সমাজে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্য থেকেই শিক্ষকতাকে জীবনের প্রধান ব্রত হিসেবে বেছে নেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক (বিএসএস অনার্স) পরীক্ষায় ৪-এর মধ্যে ৩ দশমিক ৬৭ এবং স্নাতকোত্তর (এমএসএস) পরীক্ষায় ৩ দশমিক ৮০ সিজিপিএ অর্জন করেন হাবিবুর রহমান। বর্তমানে একই বিভাগে এমফিল গবেষণার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। এমফিলের প্রথম পর্ব প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়ে সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। ভবিষ্যতে ইউরোপের কোনো একটি দেশে পিএইচডি করার ইচ্ছাও রয়েছে তাঁর।
৩৪তম বিসিএসের মাধ্যমে সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান হাবিবুর রহমান। ২০১৭ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর শিবালয় সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক (সামাজিক বিজ্ঞান) হিসেবে যোগ দেন তিনি। বর্তমানে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ইতিহাস, ভূগোল, পৌরনীতি ও অর্থনীতি পড়াচ্ছেন।
পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের চিন্তাভাবনা, সৃজনশীলতা ও আত্মবিশ্বাস বাড়াতে কাজ করেন হাবিবুর রহমান। নৈতিক মূল্যবোধ, দেশপ্রেম, দায়িত্ববোধ ও মানবিক গুণাবলির বিকাশেও গুরুত্ব দেন তিনি। শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা চিহ্নিত করে ব্যক্তিগতভাবে সহযোগিতা ও নিয়মিত দিকনির্দেশনাকে শিক্ষকতার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব মনে করেন।
আধুনিক ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক পাঠদান পদ্ধতির মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষে কার্যকর শিক্ষার পরিবেশ তৈরির পাশাপাশি বিদ্যালয়ের শিক্ষা ও সহশিক্ষামূলক কার্যক্রমেও সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন তিনি। শিক্ষকতার পাশাপাশি গবেষণার সঙ্গেও যুক্ত রয়েছেন। গণতান্ত্রিক রূপান্তর, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, নির্বাচনী ব্যবস্থা এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন বিষয় তাঁর গবেষণার অন্যতম ক্ষেত্র। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নালেও তাঁর গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।
শিক্ষাজীবনেও রয়েছে হাবিবুর রহমানের একাধিক অর্জন। ২০১১-১২ সালে ভালো ফলাফলের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি EBL-DUAA Inspiration Award পান। ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড (EBL) ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের যৌথ উদ্যোগে তাঁকে এ সম্মাননা দেওয়া হয়।
২০১৪ সালে আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে অনুষ্ঠিত One Young World Summit-এ বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নেন তিনি। সেখানে বাংলাদেশের পতাকাবাহী প্রতিনিধি হিসেবে শিক্ষা, নেতৃত্ব, উন্নয়ন ও সামাজিক বিভিন্ন বিষয়ে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পান।
এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতা সংগঠন ‘বাঁধন’-এর সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন হাবিবুর রহমান। রক্তদান, মানবিক সহায়তা ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির বিভিন্ন কার্যক্রমে তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে।
নিজের শিক্ষাদর্শন সম্পর্কে হাবিবুর রহমান বলেন, ‘একজন শিক্ষক শুধু পাঠদান করেন না, একটি প্রজন্মের চিন্তা, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন। শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা ও মানবিক গুণাবলিতে সমৃদ্ধ করে দেশ ও সমাজের জন্য যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলাই আমার লক্ষ্য।’
হাবিবুর রহমানের জাতীয় পর্যায়ে ‘গুণী শিক্ষক’ নির্বাচিত হওয়ায় গর্বিত শিবালয় সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ লুকমান হোসেন। তিনি বলেন, ‘সত্যিকার অর্থে এটি আমার অহংকার এবং গর্বের জায়গা। আমি দীর্ঘদিন যে প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব দিচ্ছি, সেখান থেকে আমি তাকে বাছাই করেছি। এরপর তিনি বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে সম্মাননা পেয়েছেন। এটি আমার জন্য অহংকারের জায়গা।’
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আমীর হোসেন বলেন, ‘সকল পর্যায়ে যাচাই-বাছাইয়ের পর তাঁর ফাইল অনুযায়ী নির্বাচন করা হয়। তাঁর প্রোফাইল দেখে আমরা আশা করেছিলাম, তিনি জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করবেন। এটা শুধু আমার নয়, সারা মানিকগঞ্জবাসীর জন্য ভালো লাগার বিষয়।’
জাতীয় পর্যায়ে ‘গুণী শিক্ষক’ হিসেবে হাবিবুর রহমানের এই স্বীকৃতি তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি শিবালয় সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও মানিকগঞ্জ জেলার জন্যও গর্বের বিষয়। তাঁর এই অর্জন শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত অন্যদের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদেরও অনুপ্রাণিত করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জি বাংলা ডেস্ক