একটি অনিয়ন্ত্রিত যান, কয়েক সেকেন্ডের বেপরোয়া গতি—নিমিষেই তছনছ হয়ে যেতে পারে একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবন। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অননুমোদিত ও বেপরোয়া ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ধাক্কায় প্রতিদিনই আহত হচ্ছেন বিভিন্ন বয়সী মানুষ। কেউ হারাচ্ছেন অঙ্গ, কেউবা হয়ে পড়ছেন স্থায়ীভাবে পরনির্ভরশীল।
এমনই এক দুর্ঘটনার শিকার ৭৬ বছর বয়সী রওশন আলী। জীবনের শেষভাগে স্বজনদের পাশে থাকার কথা থাকলেও এখন অন্যের সাহায্য ছাড়া চলতে পারেন না তিনি। চিকিৎসকদের চেষ্টায় প্রাণে বেঁচে গেলেও দুর্ঘটনায় কেটে ফেলতে হয়েছে তাঁর ডান পা।
পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রওশন আলী বলেন, একসময় তিনি ব্যবসা করতেন। কিন্তু দুর্ঘটনার পর চিকিৎসার পেছনে তাঁর জমানো অর্থের বড় অংশ শেষ হয়ে গেছে। এখন স্বাভাবিক জীবনে ফেরার কোনো পথ দেখছেন না তিনি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে রওশন আলী বলেন, ‘আমি একসময় সফল ব্যবসায়ী ছিলাম। কিন্তু এই দুর্ঘটনার পর চিকিৎসার খরচ চালাতে গিয়ে আমার সব টাকা-পয়সা শেষ হয়ে গেছে।’ বেপরোয়া অটোরিকশার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বানও জানান তিনি।
একই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন পাঁচ বছরের শিশু আবদুল্লাহ ফাহাদ। হাতে খাবার কেনার টাকা নিয়ে রাস্তা পার হওয়ার সময় দ্রুতগতির একটি অটোরিকশার ধাক্কায় গুরুতর আহত হয় সে। শিশুটির বাবা জানান, পকেটে মাত্র ১০ টাকা নিয়ে দোকানে যাওয়ার পথে দুর্ঘটনার শিকার হয় তাঁর সন্তান। এখন হাসপাতালে ব্যথায় কাতরাচ্ছে শিশুটি।
নতুন চাকরির সন্ধানে সাভারে যাওয়ার পথে দুর্ঘটনার শিকার হন মাসুদ রানা। তাঁর ভাষ্য, নিয়ন্ত্রণহীন একটি অটোরিকশা তাঁকে রাস্তার পাশের বৈদ্যুতিক খুঁটি ও দেয়ালের মাঝখানে চাপা দেয়।
চিকিৎসাধীন মাসুদ বলেন, ‘গাড়িটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আমাকে সোজা দেয়ালের সঙ্গে চেপে ধরে। এখন পর্যন্ত ৫০ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়ে গেছে, কিন্তু শারীরিক কোনো উন্নতি হচ্ছে না। কাজ বন্ধ, আয়-রোজগারও বন্ধ।’
যোগাযোগ ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার প্রভাব শুধু আহত ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; পুরো পরিবারকে এর আর্থিক ও সামাজিক বোঝা বহন করতে হয়।
তিনি বলেন, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি পঙ্গু হয়ে পড়লে পরিবারের আয় বন্ধ হয়ে যায়। পাশাপাশি চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে অনেক পরিবার আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, অনিয়ন্ত্রিত ও লাইসেন্সবিহীন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত ও পঙ্গুত্বের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
জি বাংলা ডেস্ক