ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ ঘিরে রাজধানী নয়াদিল্লিতে ব্যাপক ধরপাকড় চালিয়েছে পুলিশ। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার (১০ অক্টোবর) দিনভর অভিযানে সাত হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে আটকের মোট সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে।
পুলিশের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে শনিবার যন্তর-মন্তরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন বিক্ষোভকারীরা। তাঁদের ঠেকাতে দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার, সড়কে ব্যারিকেড স্থাপন এবং গণপরিবহনে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে, দলের মুখপাত্র সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা রয়েছেন। এ ছাড়া কয়েকজন সাংবাদিক, আইনজীবী, রাজনৈতিক নেতা ও অনলাইন কনটেন্ট নির্মাতাকেও আটক করা হয়। জার্মানিতে বসবাসকারী ভারতীয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকেও আটক করা হয়েছিল বলে খবর প্রকাশিত হয়। পরে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
বিমান থেকে নামার আগেই আটক তিন নেতা
শনিবার সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটের দিকে অভিজিৎ দিপকে ও দলের দুই মুখপাত্রকে বহনকারী একটি উড়োজাহাজ দিল্লিতে অবতরণ করে। এরপর নারী পুলিশ সদস্যদের নেতৃত্বে একটি দল উড়োজাহাজের ভেতরে প্রবেশ করে তাঁদের আটক করে।
বিমানের ভেতর থেকে ধারণ করা ভিডিও বার্তায় দিপকে পুলিশের এ পদক্ষেপের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, বিমান থেকে নামার পরও তাঁদের আটক করা যেত। উড়োজাহাজের ভেতরে পুলিশ প্রবেশ করে আটকের ঘটনাকে তিনি কর্তৃত্ববাদী আচরণ হিসেবে বর্ণনা করেন।
ভিডিওতে তাঁকে বলতে শোনা যায়, দেশ কোন দিকে যাচ্ছে? তাঁদের আটক করতে পুলিশ বিমানের ভেতরে চলে এসেছে। এ সময় দিপকে ও তাঁর সঙ্গীরা ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ ও ‘ভারত মাতা কি জয়’ স্লোগান দেন। পরে পুলিশ তাঁদের মুঠোফোন নিয়ে নেয় বলে অভিযোগ ওঠে।
পুলিশের ভাষ্য, অনুমতি ছাড়া বিক্ষোভ সমাবেশ আয়োজনের কারণে তাঁদের আটক করা হয়েছে। দিপকের দাদির মৃত্যুর খবর সামনে এলে পুলিশ তাঁকে বিষয়টি জানায় এবং নিজ শহরে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে সহযোগিতার প্রস্তাব দেয় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শনিবার রাত পর্যন্ত তিন নেতাকে কোথায় রাখা হয়েছে, কখন তাঁদের মুক্তি দেওয়া হবে কিংবা আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। সিজেপির নেতা অজিঙ্ক্য শিন্দে দিল্লি পুলিশের কমিশনারকে চিঠি দিয়ে তিন নেতার অবস্থান জানানো, তাঁদের মুক্তি এবং আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানান।
যন্তর-মন্তরমুখী সড়কে ব্যারিকেড, মেট্রো স্টেশন বন্ধ
বিক্ষোভ ঠেকাতে শনিবার দিল্লিজুড়ে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। যন্তর-মন্তরমুখী প্রধান সড়কগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং বিভিন্ন স্থানে কংক্রিটের ব্লক ও ব্যারিকেড বসানো হয়। গুরুত্বপূর্ণ সড়কে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত বিশেষ যানবাহন মোতায়েন করা হয়।
কেন্দ্রীয় দিল্লিতে প্রবেশের পথে যানবাহন থামিয়ে তল্লাশি চালানো হয়। বাসে উঠে যাত্রীদের পরিচয় ও চলাচলের উদ্দেশ্য যাচাই করেন পুলিশ সদস্যরা। বিক্ষোভে অংশ নিতে আসা অনেককে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই আটক করে বাস ও পুলিশ ভ্যানে তুলে বিভিন্ন অস্থায়ী আটককেন্দ্রে নেওয়া হয়। এসব কেন্দ্রের মধ্যে কয়েকটি বড় স্টেডিয়ামও ছিল।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েকজন বিক্ষোভকারী টলস্টয় রোড ধরে যন্তর-মন্তরের প্রায় ৭০০ গজের মধ্যে পৌঁছাতে পেরেছিলেন। তবে মূল বিক্ষোভস্থলে কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।
শনিবার দিল্লি মেট্রোর ৪৫টি স্টেশন বন্ধ রাখা হয়। পরে বন্ধের সময় বাড়িয়ে রাত ১০টা পর্যন্ত করা হয়। এরপর মেট্রো চলাচল স্বাভাবিক হয়। যন্তর-মন্তরের চারপাশের প্রায় চার কিলোমিটার এলাকায় ইন্টারনেট সেবাও বন্ধ রাখা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে শুক্রবার দিল্লিতে দূরপাল্লার কয়েকটি ট্রেন বাতিল এবং ৫৭টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। তবে মেট্রো ও রেল চলাচল পুরোপুরি বন্ধ না রাখার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশনা দিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
সাংবাদিক, আইনজীবী ও রাজনৈতিক নেতারাও আটক
বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহের সময় বিভিন্ন স্থানে কয়েকজন সাংবাদিককে আটক করে পুলিশ। তাঁদের মধ্যে হিন্দি দৈনিক নবভারত টাইমস এবং ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম স্ক্রল ও নিউজলন্ড্রির সাংবাদিকেরা ছিলেন। পরে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের বাইরে বিক্ষোভ করার সময় একদল আইনজীবীকেও আটক করা হয়েছিল। পরে তাঁদের মুক্তি দেওয়া হয়। সন্ধ্যার দিকে আটক অনেক রাজনীতিককেও ছেড়ে দেওয়া হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশের বরাতে সংবাদ সংস্থা এএনআই জানায়, আটক ব্যক্তিদের অধিকাংশকে মুক্তি দেওয়া হলেও সিজেপির তিন নেতাকে তখনো ছেড়ে দেওয়া হয়নি। তাঁদের ক্ষেত্রে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত সিজেপির নেতাদের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়েরের তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে পুলিশের এক কর্মকর্তা দাবি করেন, পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার অভিযোগে কয়েকজন বিক্ষোভকারীর বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে। আটক ব্যক্তিদের প্রতিরোধমূলক হেফাজতে রাখা হয়েছিল, যার মেয়াদ ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত হতে পারে বলে জানান তিনি।
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে ক্ষোভ
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভের পেছনে রয়েছে ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক। বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়ার অভিযোগ তুলেছে বিরোধী দল ও আন্দোলনকারীরা।
তাঁদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনে অনিয়ম হয়েছে এবং এর ফলে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নির্বাচনি সুবিধা পেতে পারে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ পড়ার অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নাম বাদ পড়ার প্রকৃত সংখ্যা, কারণ ও নির্বাচনি প্রভাব নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
সিজেপির দাবি, শান্তিপূর্ণ আন্দোলন শুরু হওয়ার আগেই নেতাদের আটক করে নেতৃত্বকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছে দিল্লি পুলিশ। এক বিবৃতিতে দলটি এ ঘটনাকে কর্তৃত্ববাদী পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করে অভিজিৎ দিপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কার নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেছে।
দলের নেতা অজিঙ্ক্য শিন্দে জানান, শীর্ষ নেতাদের আটক করা হলেও আন্দোলন বন্ধ হবে না। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে রোববার যন্তর-মন্তরমুখী কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
আটকের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন তথ্য
শনিবারের ধরপাকড় নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে বিভিন্ন মহল। বিক্ষোভকারীদের দাবি, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। অন্যদিকে পুলিশ বলছে, অনুমতি ছাড়া কর্মসূচি আয়োজন এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে শনিবার দিল্লিতে দুই হাজারের বেশি বিক্ষোভকারীকে আটকের কথা বলা হয়েছিল। অন্যদিকে দিনের শেষভাগে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে আটকের সংখ্যা সাত হাজার ছাড়ানোর কথা উল্লেখ করা হয়। বিভিন্ন সময়ের হিসাব ও প্রতিবেদনের মধ্যে পার্থক্য থাকায় মোট আটকের সংখ্যা নিয়ে নিশ্চিত কোনো একক হিসাব পাওয়া যায়নি।
রোববার যন্তর-মন্তরমুখী নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে সিজেপি। কর্মসূচি ঘিরে দিল্লির কেন্দ্রীয় এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা ও যান চলাচলে বিধিনিষেধ অব্যাহত থাকতে পারে। একই সঙ্গে দলটির তিন শীর্ষ নেতার অবস্থান ও মুক্তির বিষয়টিও পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে রয়েছে।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক