সাভারের আশুলিয়ার নরসিংহপুর এলাকায় শারমিন গ্রুপের বহুতল ভবনের ছাদ থেকে পড়ে মো. জামাল উদ্দিন (৩৯) নামের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মৃত্যু হয়েছে। শারমিন গ্রুপ কর্তৃপক্ষ ঘটনাটিকে ‘আত্মহত্যা’ বলে দাবি করলেও নিহতের পরিবারের অভিযোগ, অপমানের পর তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। পাল্টাপাল্টি দাবিতে এ মৃত্যু ঘিরে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশ বলছে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
বুধবার দুপুরে আশুলিয়ার নারী ও শিশু হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে মো. জামাল উদ্দিনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর আগে সকালে শারমিন গ্রুপের কারখানা থেকে আহত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়।
নিহত জামাল উদ্দিন গাজীপুর সদরের বুরুলিয়া ডুয়েট এলাকার মৃত মো. সেকেন্দার আলীর ছেলে। তিনি পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান শারমিন গ্রুপের ডিভিশন-৩-এর সিনিয়র মার্চেন্ডাইজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
নিহতের পরিবারের দাবি, অফিসসংক্রান্ত বা অন্য কোনো বিরোধের জেরে তাঁকে হত্যা করে ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে আত্মহত্যার নাটক সাজানো হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, মরদেহ দেখতে না দিয়েই পুলিশ দ্রুত মর্গে পাঠিয়ে দেয়। এ ঘটনায় সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন এবং দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
নিহতের স্ত্রী নাহার জানান, মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে তাঁর স্বামী জামাল উদ্দিন কারখানা থেকে ফোন করেছিলেন। তখন তিনি জানিয়েছিলেন, কারখানায় তাঁকে অপমান করা হয়েছে। বুধবার সকালেও একই কথা বলেন জামাল উদ্দিন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, স্বামী বলেছিলেন, মালিক খারাপ এবং তাঁকে দিয়ে যেকোনো কিছু করানো হতে পারে।
নাহার জানান, তাঁকে অফিসে যেতে নিষেধ করেছিলেন তিনি। অফিস থেকে তাঁকে ফাঁসিয়ে দেওয়া হতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে স্বামী অফিসে যান। তবে অফিসে যাওয়ার পর তিনি আর ফোন ধরেননি। প্রায় দুই ঘণ্টা পর একজন ফোন ধরে জানান, জামাল উদ্দিন অসুস্থ। তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরে আবার ফোন করে জানানো হয়, তিনি আত্মহত্যা করেছেন। নাহারের দাবি, তাঁর স্বামী কখনো আত্মহত্যা করতে পারেন না। তিনি আরও অভিযোগ করেন, শারমিন গ্রুপের মালিকের ছেলে তাঁর স্বামীকে অপমান করেছিলেন।
নিহতের ভাই ফখরুল হাসান জানান, বুধবার সকালে অফিসে যাওয়ার পর সাড়ে ৯টার দিকে তাঁদের জানানো হয়, জামাল উদ্দিন ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে মারা গেছেন। তাঁর দাবি, ছোট সন্তান থাকা এবং প্রতিষ্ঠিত কর্মকর্তা হওয়ায় জামাল উদ্দিন আত্মহত্যা করতে পারেন না। ঘটনাটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর আরও দাবি, কারখানা কর্তৃপক্ষ ও ভেতরের লোকজন ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
প্রাথমিক সুরতহালকারী আশুলিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ফাহিম জানান, নিহতের হাত ও পা ভেঙে গিয়ে থাকতে পারে। ছাদ থেকে পড়ে যাওয়ার কারণে তাঁর নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বের হয়েছে।
শারমিন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইসমাইল হোসেন বলেন, জামাল উদ্দিন বুধবার সকালে নির্ধারিত সময়ের আগেই অফিসে এসেছিলেন। তাঁরা সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেখেছেন এবং তা সাংবাদিক ও পুলিশকে সরবরাহ করেছেন।
ইসমাইল হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, ফুটেজে জামাল উদ্দিনকে নিজে ছাদে যেতে এবং প্রায় দুই মিনিট ফোনে কথা বলতে দেখা গেছে। এরপর তিনি ছাদের নিরাপত্তাদেয়ালের ওপর প্রায় ১৫ মিনিট বসে থাকার পর লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেন। পুলিশ তদন্ত করে এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর তাঁকে মারধর করা হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত করতে পারবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ বিষয়ে আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম জানান, পুলিশ ঘটনাটি তদন্ত করছে। নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।
জি বাংলা ডেস্ক