ইরাকে থাকা শেষ মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো থেকে আগামী বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সেনা প্রত্যাহার করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। দুই দশকের বেশি সময় ধরে দেশটিতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির পর এ প্রত্যাহারকে ইরান ও দেশটির মিত্ররা বিজয় হিসেবে দেখছে। তবে ইরাকের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, মার্কিন সেনা চলে গেলে দেশটিতে ইরানপন্থি শক্তির প্রভাব বাড়তে পারে এবং ইসলামিক স্টেট (আইএস) নতুন করে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
২০২৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনের সময়ে ইরাক থেকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে সমঝোতা হয়। বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছে।
ইরানি-সমর্থিত শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নিয়ে কাজ করা ইরাকি নিরাপত্তা বিশ্লেষক জাসিম আল-বাহাদলি বলেন, মার্কিন সেনা চলে গেলে ইরাকে তেহরানের প্রভাবের ভারসাম্য রক্ষাকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক শক্তি আর থাকবে না। ইরানপন্থি মিলিশিয়াগুলো এই প্রত্যাহারকে নিজেদের বিজয় হিসেবে তুলে ধরে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।
ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর জোট ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’-এর কমান্ডার আবু মুজতবা আল-ইয়াসিরি মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার ভাষ্য, ৩০ সেপ্টেম্বর ইরাকের ইতিহাসের একটি ‘কালো অধ্যায়ের’ সমাপ্তি হবে।
তবে প্রত্যাহার নিয়ে ইরাকে উদ্বেগও রয়েছে। ফালুজার সুন্নি গোত্রীয় নেতা আবদুর রহমান আল-জোবাই বলেন, ইরাক এখনো পুরোপুরি নিজস্ব নিরাপত্তাব্যবস্থা পরিচালনার জন্য প্রস্তুত নয়। তার মতে, পূর্ণ সার্বভৌমত্বের আকাঙ্ক্ষা থাকলেও মার্কিন জোটের চলে যাওয়ায় সম্ভাব্য নিরাপত্তা শূন্যতা উদ্বেগের বিষয়।
২০০৩ সালে ইরাকে সামরিক অভিযান চালিয়ে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করে যুক্তরাষ্ট্র। ২০১১ সালের শেষে মার্কিন সেনারা ইরাক থেকে প্রত্যাহার করে নিলেও ২০১৪ সালে ইসলামিক স্টেটের উত্থানের পর তারা আবার দেশটিতে ফিরে আসে। ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইরাকি বাহিনীকে সহায়তা করে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট।
ইরাক একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—দুই দেশের সঙ্গেই রাজনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। ২০২০ সালে বাগদাদ বিমানবন্দরে মার্কিন হামলায় ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার কাসেম সোলেইমানি নিহত হওয়ার পর ইরানপন্থি গোষ্ঠীগুলো ইরাকে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে একাধিক হামলা চালায়।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে তাদের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরে আসছে। দেশটির পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের উপপ্রধান আমির হায়াত মুকাদ্দাম বলেন, মার্কিন সেনারা ইরাক ও পুরো অঞ্চল থেকে চলে গেলে সেখানে দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হবে।
অন্যদিকে, ইরাকের কেন্দ্রীয় সরকার ও কুর্দি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের কয়েকজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা আশঙ্কা করছেন, মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ফলে আইএস পুনর্গঠনের সুযোগ পেতে পারে। তাদের মতে, আইএসের কথিত খেলাফত বিলুপ্ত হলেও সংগঠনটির ঘুমন্ত সেল ও গোপন নেটওয়ার্ক এখনো সক্রিয় রয়েছে।
কুর্দি কমান্ডার সিরওয়ান বারজানি বলেন, মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য, লজিস্টিক সহায়তা ও ড্রোনের উপস্থিতি কমে গেলে আইএস পুনর্গঠনের সুযোগ পেতে পারে। ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনীও জানিয়েছে, মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে কেন্দ্র করে আত্মঘাতী হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল আইএসের একটি সন্দেহভাজন সেল।
ইরাকের নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল খালিদ আল-বায়াতির মতে, এমন হামলার মাধ্যমে আইএস নিজেদের সক্রিয়তা ও হামলা চালানোর সক্ষমতার বার্তা দিতে চাইতে পারে।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক