যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্কের বিভিন্ন মতপার্থক্য নিয়ে এবার প্রকাশ্যেই নিজেদের উদ্বেগের কথা জানাচ্ছে ভারত। বাণিজ্যনীতি, রাশিয়া থেকে তেল আমদানি, পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক, সন্ত্রাসবাদ এবং অভিবাসননীতির মতো ইস্যুতে নয়াদিল্লির অসন্তোষ সাম্প্রতিক সময়ে আরও স্পষ্ট হয়েছে।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে এশিয়া সোসাইটির এক অনুষ্ঠানে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বলেন, পাকিস্তান থেকে আসা সন্ত্রাসবাদ নিয়ে ভারতের উদ্বেগ যুক্তরাষ্ট্র যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে না দেখলে তা দুই দেশের সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে। তাঁর বক্তব্যে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের বর্তমান টানাপোড়েনের কয়েকটি দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
জয়শঙ্কর বলেন, সন্ত্রাসবাদ ভারতের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবেশী দেশ থেকে সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদের মুখোমুখি হয়েছে ভারত। এই উদ্বেগকে অংশীদার দেশগুলো যথাযথভাবে না বুঝলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে তার প্রভাব পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক ঘনিষ্ঠতাও নয়াদিল্লির এই উদ্বেগের অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
বাণিজ্যও ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে বড় আলোচনার বিষয়। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দুই দেশের পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৪৯ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার। ওই বছর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের পণ্য বাণিজ্যে ভারতের উদ্বৃত্ত ছিল ৫৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে দুই দেশের মধ্যে একটি বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চললেও তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
বিশেষ করে কৃষি ও বাজার উন্মুক্ত করার প্রশ্নে দুই দেশের স্বার্থের পার্থক্য রয়েছে। ভারতের কৃষি খাতকে সুরক্ষা দেওয়া এবং বাজারে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার নীতির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর বাজার-প্রবেশের প্রত্যাশার সমন্বয় করা বাণিজ্য আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। জয়শঙ্করও বিভিন্ন দেশের নীতি নির্ধারণে তাদের নিজস্ব অর্থনীতি ও জনগণের স্বার্থ বিবেচনার বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
রাশিয়া থেকে ভারতের তেল কেনাও ওয়াশিংটনের সঙ্গে টানাপোড়েনের আরেকটি কারণ। রাশিয়ার তেল আমদানির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি ও অন্যান্য বাণিজ্যিক পদক্ষেপ নিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে চাপ তৈরি হয়েছে। তবে একই সময়ে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য আলোচনাও চালিয়ে যাচ্ছে। ৩০ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও ট্রাম্প ফোনে কথা বলেন এবং দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব, বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি ও প্রযুক্তি সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেন।
অভিবাসন ও এইচ-১বি ভিসানীতিও দিল্লির উদ্বেগের তালিকায় রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন ১৮ সেপ্টেম্বর নতুন করে এইচ-১বি কর্মসূচির ওপর বিধিনিষেধ এক বছর বাড়িয়েছে। এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থাকা নির্দিষ্ট নতুন এইচ-১বি কর্মীদের আবেদনের সঙ্গে ১ লাখ ডলারের অর্থপ্রদানের শর্ত বহাল রাখা হয়েছে, যদিও কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে। ভারতীয় প্রযুক্তি ও দক্ষ কর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে এই কর্মসূচির বড় অংশ ব্যবহার করে আসায় নীতিটির প্রভাব নিয়ে ভারতে উদ্বেগ রয়েছে।
জয়শঙ্কর একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন ও মানুষের আন্তর্জাতিক চলাচল নিয়ে বাড়তে থাকা বিধিনিষেধের বিষয়টিও তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্যে বোঝা যায়, ভারতের কাছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক শুধু পণ্য বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; দক্ষ কর্মীদের চলাচল ও প্রযুক্তি খাতের সহযোগিতাও দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে মতপার্থক্য বাড়লেও ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে—এমন কোনো সরকারি অবস্থান দুই দেশের পক্ষ থেকে দেখা যায়নি। বরং সাম্প্রতিক ফোনালাপ এবং চলমান বাণিজ্য আলোচনায় দুই দেশই সম্পর্কের কৌশলগত কাঠামো বজায় রাখার কথা বলছে। ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গয়ালও সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে একটি অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছেন।
ফলে সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের চিত্রটি একদিকে বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি ও প্রযুক্তিতে সহযোগিতা অব্যাহত থাকা এবং অন্যদিকে পাকিস্তান, সন্ত্রাসবাদ, রাশিয়ার তেল ও অভিবাসননীতির মতো বিষয়ে মতপার্থক্য প্রকাশ্যে আসার মধ্য দিয়ে তৈরি হচ্ছে। জয়শঙ্করের সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই মতপার্থক্যগুলোকে আগের তুলনায় আরও স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে।