নতুন গাড়ি কেনার সময় অনেকেরই প্রশ্ন থাকে—একই মডেলের ডিজেল ও পেট্রোল ভ্যারিয়েন্ট দেখতে প্রায় একই হলেও ডিজেল গাড়ির দাম বেশি কেন? শোরুমে পাশাপাশি রাখা দুটি গাড়ির মধ্যে ডিজেল ভ্যারিয়েন্টের দাম অনেক সময় ১ লাখ থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত বেশি হতে দেখা যায়। এর পেছনে মূল কারণ ইঞ্জিনের গঠন, ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ এবং নির্গমন নিয়ন্ত্রণের অতিরিক্ত ব্যবস্থা।
সাধারণত ডিজেল ইঞ্জিনে পেট্রোল ইঞ্জিনের তুলনায় বেশি কম্প্রেশন ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ জ্বালানি জ্বালানোর আগে বাতাসকে বেশি চাপ দিয়ে সংকুচিত করতে হয়। এ কারণে ডিজেল ইঞ্জিনে তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী ও টেকসই যন্ত্রাংশ ব্যবহার করতে হয়।
ডিজেল গাড়ির আধুনিক ইঞ্জিনে টার্বোচার্জার, ইন্টারকুলার এবং উচ্চচাপের Common-Rail Injection System ব্যবহৃত হয়। এই ব্যবস্থায় অত্যন্ত উচ্চচাপে ইঞ্জিনে জ্বালানি সরবরাহ করা হয়, যা ২ হাজার বার বা তারও বেশি হতে পারে। উচ্চমানের ও নির্ভুল এসব যন্ত্রাংশ তৈরি ও সংযোজনের খরচও বেশি।
দামের পার্থক্যের আরেকটি বড় কারণ হলো নির্গমন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। ডিজেল ইঞ্জিন থেকে নির্গত ক্ষতিকর কণা নিয়ন্ত্রণে আধুনিক গাড়িতে DPF বা Diesel Particulate Filter ব্যবহার করা হয়। অনেক গাড়িতে দূষণ কমাতে SCR System এবং AdBlue ব্যবস্থাও থাকে। এসব অতিরিক্ত প্রযুক্তি গাড়ির উৎপাদন খরচ বাড়ায়।
এ ছাড়া বিভিন্ন দেশে গাড়ির নির্গমন নিয়ে কঠোর বিধিনিষেধ চালু হওয়ায় ডিজেল ইঞ্জিনকে নির্ধারিত মান পূরণ করতে আরও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হচ্ছে। এ কারণেই অনেক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডিজেল ইঞ্জিনের ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছে বা কিছু মডেলে তা বন্ধ করেছে।
তবে বেশি দাম হওয়ার বিপরীতে ডিজেল গাড়ির মাইলেজ সাধারণত পেট্রোল গাড়ির চেয়ে বেশি। উদাহরণ হিসেবে ভারতের দিল্লিতে ডিজেলের দাম পেট্রোলের তুলনায় প্রতি লিটারে প্রায় ৭ টাকা কম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে বেশি দূরত্বে গাড়ি চালালে জ্বালানি খরচের দিক থেকে ডিজেল গাড়ি সুবিধা দিতে পারে।
তবে গাড়ি কেনার সময় শুধু জ্বালানির দাম বা মাইলেজ হিসাব করলেই হবে না। ডিজেল গাড়ির সার্ভিসিং ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচও তুলনামূলক বেশি হতে পারে। টার্বোচার্জার, DPF, ইনজেক্টরসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশের রক্ষণাবেক্ষণে অতিরিক্ত ব্যয় হয়।
একটি হিসাব অনুযায়ী, বছরে প্রায় ১৫ হাজার কিলোমিটার গাড়ি চালালে ডিজেল ভ্যারিয়েন্টের জন্য অতিরিক্ত যে টাকা খরচ হয়, তা উঠে আসতে পাঁচ বছরেরও বেশি সময় লাগতে পারে। তাই যাঁরা প্রতিদিন দীর্ঘ দূরত্বে গাড়ি চালান, তাঁদের জন্য ডিজেল গাড়ি অর্থনৈতিকভাবে বেশি সুবিধাজনক হতে পারে। অন্যদিকে শহরের মধ্যে কম দূরত্বে নিয়মিত চলাচলের ক্ষেত্রে পেট্রোল গাড়ি তুলনামূলকভাবে উপযোগী হতে পারে।
অর্থাৎ ডিজেল গাড়ির বাড়তি দাম শুধু নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত লাভের কারণে নয়। শক্তিশালী ইঞ্জিন, উচ্চচাপের ফুয়েল সিস্টেম, টার্বোচার্জার এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণের অতিরিক্ত প্রযুক্তি—সব মিলিয়েই ডিজেল ভ্যারিয়েন্টের উৎপাদন খরচ বাড়ে। গাড়ি কেনার আগে তাই নিজের দৈনিক যাতায়াত, বার্ষিক মাইলেজ এবং রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বিবেচনা করেই পেট্রোল না ডিজেল—সিদ্ধান্ত নেওয়া ভালো।