চার-পাঁচ বছরের শিক্ষাজীবন শেষ করে কাঙ্ক্ষিত ডিগ্রি হাতে পাওয়ার দিনটি একজন শিক্ষার্থীর জন্য বিশেষ মুহূর্ত। ক্লাস, পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্ট ও গবেষণার নানা ধাপ পেরিয়ে সমাবর্তনের মঞ্চে হ্যাট-গাউন পরে ডিগ্রি গ্রহণের মধ্য দিয়ে সেই অর্জন পায় আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। সহপাঠী, শিক্ষক ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে উদযাপনের এই দিনটি তাই শিক্ষাজীবনের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায়।
তবে দেশের অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সেই অপেক্ষা দীর্ঘ হচ্ছে। বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও সমাবর্তন আয়োজন না হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত ‘গৌরবের দিনটির’ দেখা পাচ্ছেন না তাঁরা। এমনই অপেক্ষায় রয়েছেন রাজধানীর মুগদায় অবস্থিত বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিআইইউ) শিক্ষার্থীরা।
বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৮ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি। এরপর প্রায় আট বছর পার হলেও এখনো দ্বিতীয় সমাবর্তনের আয়োজন হয়নি। ফলে বিভিন্ন ব্যাচের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ নিয়ে অসন্তোষ ও হতাশা তৈরি হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের কাছে সমাবর্তন শুধু হ্যাট-গাউন পরে ছবি তোলার আনুষ্ঠানিকতা নয়। কয়েক বছরের পড়াশোনা, পরিবারের আর্থিক ও মানসিক সহযোগিতা এবং নানা প্রতিকূলতার পর ডিগ্রি অর্জনের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিও এই আয়োজনের মাধ্যমে আসে। বিশেষ করে বাবা-মায়ের সামনে সন্তানকে ডিগ্রি গ্রহণ করতে দেখার মুহূর্তটি অনেক পরিবারের জন্য আবেগঘন হয়ে ওঠে।
নৃতত্ত্ব ও মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় সমাবর্তনকে অনেক সময় ‘রাইট অব প্যাসেজ’ বা জীবনান্তরের আনুষ্ঠানিক ধাপ হিসেবে দেখা হয়। শিক্ষাজীবনের একটি অধ্যায় শেষ করে কর্মজীবন কিংবা উচ্চশিক্ষার নতুন পর্যায়ে প্রবেশের পরিবর্তনকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিহ্নিত করে এ আয়োজন। একই সঙ্গে পুরোনো সহপাঠী ও শিক্ষকদের সঙ্গে পুনর্মিলন এবং অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক তৈরির সুযোগও তৈরি হয়।
দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয় ১৯৯২ সালে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে। এরপর কয়েক দশকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা শতাধিক হয়েছে। তবে সব প্রতিষ্ঠানে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম একই গতিতে এগোয়নি। বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনিক কাঠামো, উপাচার্য নিয়োগ, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও একাডেমিক পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পাশাপাশি নিয়মিত সমাবর্তন না হওয়া নিয়েও শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ রয়েছে।
দৈনিক ইত্তেফাকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পূর্ণকালীন উপাচার্য না থাকাসহ বিভিন্ন কারণে অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন আয়োজন আটকে রয়েছে। বাংলা ট্রিবিউনের এক প্রতিবেদনে দেশের ১০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো একবারও সমাবর্তন না হওয়ার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
সমাবর্তনের গুরুত্ব শুধু আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিতেই সীমাবদ্ধ নয়। উচ্চশিক্ষা নিয়ে আর্নেস্ট পাসকারেলা ও প্যাট্রিক টেরেনজিনির গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয়-অভিজ্ঞতা এবং বৃহত্তর একাডেমিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততার গুরুত্ব উঠে এসেছে। সমাবর্তনের মতো আয়োজন শিক্ষার্থীদের সেই বৃহত্তর সম্প্রদায়ের অংশ হিসেবে নিজেদের অনুভব করার সুযোগ দিতে পারে। পাশাপাশি অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক ভবিষ্যতে চাকরি, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় যোগাযোগের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে, দেশের কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত সমাবর্তন আয়োজনের নজির রয়েছে। আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামে (আইআইইউসি) ইতোমধ্যে ছয়টি সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়েছে। চলতি বছরের শুরুতেও বিশ্ববিদ্যালয়টির ষষ্ঠ সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এ অবস্থায় বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন—অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়মিত সমাবর্তন আয়োজন করতে পারলেও তাঁদের প্রতিষ্ঠানে দ্বিতীয় সমাবর্তনের জন্য এত দীর্ঘ অপেক্ষা কেন?
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য একজন শিক্ষার্থী ও তাঁর পরিবার অর্থ, সময় ও শ্রম বিনিয়োগ করেন। তাই শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, শুধু ডিগ্রি প্রদান নয়, শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতাগুলোও যথাসময়ে সম্পন্ন করবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে দ্রুত দ্বিতীয় সমাবর্তনের আয়োজনের দাবি তাঁদের।