বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার সাত বছর পেরিয়ে গেলেও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে এখনও শুনানি শুরু হয়নি। বিচারিক আদালত ও হাইকোর্টে আসামিদের সাজা বহাল থাকলেও আপিলের শুনানি ঝুলে থাকায় হতাশা প্রকাশ করেছে আবরারের পরিবার।
রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, আপিল বিভাগে মামলাটির শুনানি শুরু হলে তারা কোনো ধরনের বিলম্ব করবে না। অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, মামলাটি কার্যতালিকায় এলে নিয়ম অনুযায়ী শুনানি হবে।
মামলার দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে আবরারের ভাই ও বুয়েটের সাবেক শিক্ষার্থী আবরার ফাইয়াজ দ্রুত আপিল শুনানি শেষ করার দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, মামলাটি অন্তত কার্যতালিকায় এনে দ্রুত শুনানি শেষ করা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ফাইয়াজের ভাষ্য, মামলাটির বিষয়ে তিনি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেছেন। অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গেও এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তাঁর প্রশ্ন, আসামিরা কারাগারে থাকা সত্ত্বেও মামলাটির বিচার আপিল বিভাগে শুরু হতে এত সময় লাগছে কেন।
অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ কোনো মামলার শুনানিতে বিলম্ব করতে চায় না। আপিল বিভাগে শুনানি শুরু হলে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে মুলতবির আবেদন করা হবে না এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে তারা মামলাটি পরিচালনা করবেন।
তিনি বলেন, মৃত্যুদণ্ডের মামলা হওয়ায় সংবিধানের ১০৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিষয়টি আপিল বিভাগে যাবে। রাষ্ট্রপক্ষ সেখানে মামলার পক্ষে জোরালোভাবে যুক্তি উপস্থাপন করবে। একই সঙ্গে নিরপরাধ কেউ যেন শাস্তির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলে উল্লেখ করেন তিনি।
অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, আপিল বিভাগে মামলাটি গেলে শুনানি হবে। তবে মামলাটি এখনও কার্যতালিকায় ওঠেনি। তাঁর দাবি, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ইশতিয়াক আহমেদ মুন্না ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে ছিলেন না। এ বিষয়ে মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণও রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামির আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু বলেন, মামলাটির প্রায় ১০ হাজার পৃষ্ঠার পেপারবুক তৈরি হয়েছে। আপিল বিভাগে মামলা বিচারাধীন থাকলেও তা এখনও কার্যতালিকায় ওঠেনি। তাঁর মতে, আপিল বিভাগের মামলা সাধারণত সিরিয়াল অনুযায়ী শুনানি হয়। তবে প্রধান বিচারপতি চাইলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কোনো মামলা শুনতে পারেন।
মামলার প্রেক্ষাপট
২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলে আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পরদিন তাঁর বাবা বরকত উল্লাহ চকবাজার থানায় মামলা করেন। মামলায় ১৯ জনকে আসামি করা হয়। পরে তদন্ত শেষে ২৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।
২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ মামলার রায়ে ২০ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।
এরপর মামলাটি হাইকোর্টে আসে। ডেথ রেফারেন্স, আসামিদের আপিল ও জেল আপিলের ওপর শুনানি শেষে হাইকোর্ট বিচারিক আদালতের রায় বহাল রাখেন।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, আবরার হত্যাকাণ্ড পূর্বপরিকল্পিত ছিল। আদালত উল্লেখ করেন, রাজনৈতিক মতভেদ বা কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের সন্দেহে কাউকে নির্যাতন করে হত্যা করার সুযোগ নেই। ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক আধিপত্য ও হলের নির্যাতনের সংস্কৃতি বন্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও রায়ে বলা হয়।
হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে বর্তমানে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েকজন আসামি আপিল করেছেন এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরাও লিভ টু আপিল করেছেন। তবে এসব আপিল এখনও আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় শুনানির জন্য ওঠেনি।
আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনায় মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা ২০ আসামির সবাই বুয়েটের সাবেক শিক্ষার্থী। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল থাকা পাঁচ আসামি হলেন মুহতাসিম ফুয়াদ হোসেন, মো. আকাশ হোসেন, মুয়াজ আবু হুরায়রা, অমিত সাহা ও ইশতিয়াক আহমেদ মুন্না।
আবরার হত্যার পর এ ঘটনা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক সহিংসতা ও আবাসিক হলের নির্যাতন নিয়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আবরার ফাহাদকে মরণোত্তর দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পদক’ দেওয়া হয়।