রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের এ ব্লকের ১৭৭ নম্বর ঘরে জন্ম ও বেড়ে ওঠা মো. রাজা ওরফে ‘পিচ্চি রাজা’। ২৭ বছর বয়সী এই যুবক কিশোর বয়সেই অপরাধজগতে জড়িয়ে পড়েন বলে জানিয়েছে পুলিশ। বর্তমানে মাদক কারবার, হত্যা, অস্ত্র ও বিস্ফোরকসহ বিভিন্ন মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে ৩০টির বেশি মামলা রয়েছে বলে পুলিশের দাবি।
পুলিশ সূত্র জানায়, ২০১৪ সালে জেনেভা ক্যাম্পের শীর্ষ মাদক কারবারি ইশতিয়াকের সহযোগী হিসেবে অপরাধে জড়ান রাজা। ওই সময় থেকেই তিনি পুলিশের সোর্স হিসেবেও কাজ শুরু করেন বলে দাবি পুলিশের। মাঝখানে একটি সিএনজি পাম্পে চাকরি করলেও পরে আবার মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়েন তিনি।
২০১৮ সালে ৫১টি ইয়াবাসহ প্রথমবার গ্রেপ্তার হন রাজা। দুই মাস কারাভোগের পর জামিনে বেরিয়ে নিজের অপরাধী নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করেন বলে পুলিশ জানায়। ২০২০ সালে তাঁর সহযোগী ইশতিয়াক কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে জেনেভা ক্যাম্পের মাদক কারবারের বড় একটি অংশ রাজার নিয়ন্ত্রণে আসে বলে পুলিশের দাবি। একপর্যায়ে টেকনাফ থেকে সরাসরি মাদকের চালান আনার রুটও তৈরি করেন তিনি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জেনেভা ক্যাম্পে মাদক স্পট ও বিভিন্ন এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাজার গ্রুপের সঙ্গে বুনিয়া সোহেলসহ বিভিন্ন গ্রুপের সংঘর্ষ শুরু হয় বলে পুলিশ জানায়। বাজার ও লাইনম্যান নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে এসব সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
চলতি বছরের ১৯ মে নেপাল থেকে ঢাকায় ফেরার সময় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে রাজাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে তিনি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ক্যাম্পের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের আধিপত্য বিস্তারের লড়াই থেকেই এসব হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাতের কথা জানান।
মাদক কারবারের পাশাপাশি রাজার বিরুদ্ধে বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় তাঁর একাধিক ফ্ল্যাট ও প্লট এবং মোহাম্মদপুরের সিএনজি অটোরিকশা সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের তথ্য পাওয়া গেছে। হামলা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের জন্য তাঁর নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী রয়েছে বলেও পুলিশের দাবি। তাঁর বিরুদ্ধে মাদক, অস্ত্র, হত্যা ও বিস্ফোরকসহ ৩০টির বেশি মামলা রয়েছে; এর মধ্যে মোহাম্মদপুর থানাতেই রয়েছে ২৫টি মামলা।
প্রিজন ভ্যান থেকে নিখোঁজ
গ্রেপ্তারের পর রাজাকে কাশিমপুর কারাগারে রাখা হয়েছিল। গত ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকার আদালতে হাজিরা শেষে কারাগারে ফেরার পথে প্রিজন ভ্যান থেকে তিনি রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন।
পুলিশের তদন্তে উঠে আসে, তাঁতীবাজার এলাকায় আগে থেকেই একটি প্রাইভেটকার নিয়ে রাজার বোন ও আরেক নারী অপেক্ষা করছিলেন। পুলিশের অভিযোগ, দায়িত্বে থাকা এসআই প্রবীর কুমার নিজেই রাজাকে ওই গাড়িতে তুলে দেন। পরে গাড়িটি চলে যাওয়ার পর এসআই প্রবীর অন্য একটি বাহনে করে গাজীপুরের বাইমাইল এলাকায় গিয়ে আবার প্রিজন ভ্যানে ওঠেন।
তদন্তে আরও জানা যায়, ওই দিন রাজার বোনের সঙ্গে এসআই প্রবীরের অন্তত ১৩ বার হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ হয়। এ ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে এসআই প্রবীর, গাড়িচালক কামাল হোসেনসহ পাঁচ পুলিশ সদস্যকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
এ ছাড়া এসআই প্রবীর, চালক কামাল ও রাজার বোন তাসলিমাকে গ্রেপ্তার করে চার দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। চালক কামালের বাসা থেকে ৬০ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গাজীপুর মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সৈয়দ মো. মিজানুর ইসলাম বলেন, রাজাকে পালাতে সহায়তা করতে কী পরিমাণ আর্থিক লেনদেন হয়েছে, তা রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে জানার চেষ্টা করা হচ্ছে।