নেদারল্যান্ডসভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট নকল করে অনলাইনভিত্তিক চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে ২৪ লাখ ১৯ হাজার ১৯৯ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সংঘবদ্ধ চক্রের এক নারী সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
গ্রেপ্তার নারীর নাম প্রীয়ন্তী সরকার চিত্রা (২২)। গত ৮ অক্টোবর রাত ১১টার দিকে রাজধানীর উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টর এলাকা থেকে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর বাড়ি রংপুরের সাতগাড়া এলাকায়।
শনিবার (১০ অক্টোবর) সিআইডির পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী একজন ব্যবসায়ী। ২০২৫ সালের আগস্টে সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্যরা টেলিগ্রাম আইডি থেকে তাঁকে অনলাইন পার্টটাইম চাকরির প্রস্তাব দেন। নেদারল্যান্ডসভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের আদলে তৈরি নকল ওয়েবসাইট ব্যবহার করে তাঁকে একটি ট্রাভেল প্ল্যাটফর্মে বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে ইতিবাচক রেটিং ও ফিডব্যাক দেওয়ার কাজের প্রস্তাব দেওয়া হয়। এর বিনিময়ে প্রতিদিন ৮০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা আয়ের প্রলোভন দেখানো হয়।
প্রস্তাবে আকৃষ্ট হয়ে কাজ শুরু করলে ভুক্তভোগীকে কয়েক দফায় পারিশ্রমিকও দেওয়া হয়। পরে তাঁকে টেলিগ্রামের একটি গ্রুপে যুক্ত করা হয়। সেখানে প্রতিষ্ঠানের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে ১ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের বিপরীতে আকর্ষণীয় মুনাফার প্রস্তাব দেওয়া হয়। অন্য সদস্যদের বিনিয়োগের প্রমাণ হিসেবে ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়ার কথিত স্লিপ দেখানো হলে তিনি বিনিয়োগে আগ্রহী হন।
এজাহার অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২২ আগস্ট ভুক্তভোগী তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব থেকে প্রথমে ১ লাখ টাকা চক্রের দেওয়া একটি ব্যাংক হিসাবে পাঠান। পরে ওয়েবসাইটে নির্দিষ্টসংখ্যক ভিজিট সম্পন্ন করা, বিভিন্ন রাউন্ডে অংশ নেওয়া ও অন্যান্য শর্ত পূরণের কথা বলে তাঁকে আরও টাকা পাঠাতে প্ররোচিত করা হয়। এভাবে একই দিনে বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব ও ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে তাঁর কাছ থেকে মোট ২৪ লাখ ১৯ হাজার ১৯৯ টাকা নেওয়া হয়।
চক্রটি ওই অর্থের একটি অংশ বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করে। তবে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ভুক্তভোগীকে মুনাফা বা মূলধন—কোনোটিই ফেরত দেওয়া হয়নি। পরে আরও টাকা দাবি করা হলে তাঁর সন্দেহ হয়। বিনিয়োগের অর্থ ফেরত চাইলে নতুন করে টাকা পাঠানোর কথা বলা হয়। একপর্যায়ে চক্রের সদস্যরা যোগাযোগ বন্ধ করে দেন।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগী আদালতের মাধ্যমে পল্টন থানায় মামলা করেন। ২০২৫ সালের ১ নভেম্বর দায়ের করা মামলায় দণ্ডবিধির ৩৪, ১০৯, ৪০৬ ও ৪২০ ধারা উল্লেখ করা হয়েছে।
সিআইডি জানায়, তদন্তে ‘লিজা’ নাম ব্যবহারকারী এক সন্দেহভাজনের নির্দেশনার সঙ্গে অর্থ পাঠানোর সময়ের যোগসূত্র পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ভুক্তভোগীর বিশ্বাস অর্জন করে তাঁকে ধীরে ধীরে বেশি অর্থ বিনিয়োগে প্রলুব্ধ করার উদ্দেশ্যে গ্রেপ্তার প্রীয়ন্তী সরকার চিত্রার নামে নিবন্ধিত মোবাইল আর্থিক সেবার হিসাব থেকে তাঁকে পারিশ্রমিক পাঠানোর তথ্য পাওয়া গেছে।
সিআইডির ভাষ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে চিত্রা ওই অর্থ পাঠানোর নির্দেশদাতা সম্পর্কে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। প্রতারণার ঘটনায় তাঁর সংশ্লিষ্টতা এবং অর্থের উৎস ও গন্তব্য সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহে তদন্ত চলছে।
সিআইডি আরও জানায়, একই মামলায় বিভিন্ন সময়ে চিত্রা ছাড়াও ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। তাঁদের মধ্যে চারজন আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
অনলাইনভিত্তিক চাকরি, বিভিন্ন টাস্ক সম্পন্ন করে আয়ের প্রলোভন এবং অপরিচিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে সিআইডি। এ ধরনের প্রতারণার শিকার হলে সংশ্লিষ্ট তথ্য-প্রমাণ সংরক্ষণ করে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।