দুর্গাপ্রতিমায় পতিতালয়ের মাটি ব্যবহার করা হয় কেন?

আপলোড সময় : ১১-১০-২০২৬ ১১:১৮:৩৩ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ১১-১০-২০২৬ ১১:১৮:৩৩ পূর্বাহ্ন

শারদীয় দুর্গোৎসব এলেই ঢাকের বাদ্যি, ধূপের গন্ধ আর আলোকসজ্জায় মুখর হয়ে ওঠে বাংলার পূজামণ্ডপগুলো। দেবী দুর্গার আরাধনাকে ঘিরে নানা আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে একটি রীতি দীর্ঘদিন ধরেই মানুষের কৌতূহলের বিষয়—দুর্গাপ্রতিমা তৈরিতে গঙ্গার পলিমাটির পাশাপাশি যৌনপল্লির মাটি ব্যবহারের প্রচলিত বিশ্বাস।

সমাজে দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার মানুষের বসতির মাটি কেন দেবীর প্রতিমা তৈরির সঙ্গে যুক্ত—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে সামনে আসে ধর্মীয় বিশ্বাস, লোককথা ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির নানা ব্যাখ্যা। তবে এ প্রথার উৎপত্তি নিয়ে প্রচলিত সব কাহিনির ঐতিহাসিক বা শাস্ত্রীয় ভিত্তি সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।

প্রতিমা তৈরিতে ‘পুণ্যমাটি’র ধারণা

বাংলার লোকাচারে যৌনপল্লির মাটি ‘পুণ্যমাটি’ বা ‘নিষিদ্ধপল্লির মাটি’ নামে পরিচিত। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, দুর্গাপ্রতিমা তৈরির মাটির সঙ্গে গঙ্গার পলিমাটি, গোবর, গোমূত্রসহ বিভিন্ন উপাদান ব্যবহারের রীতি রয়েছে। কিছু বর্ণনায় যৌনপল্লির মাটির কথাও উল্লেখ করা হয়। তবে অঞ্চল, প্রতিমাশিল্পী ও স্থানীয় প্রথাভেদে এ রীতির চর্চায় পার্থক্য থাকতে পারে।

লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, যৌনপল্লি থেকে মাটি সংগ্রহের ক্ষেত্রেও বিশেষ আচারের কথা বলা হয়। প্রচলিত বর্ণনায়, পুরোহিত বা প্রতিমাশিল্পী সেখানকার বাসিন্দাদের কাছে মাটি চাইতে যান। বাসিন্দারা স্বেচ্ছায় মাটি দান করলে তা গ্রহণ করা হয়। এ বর্ণনায় দানের সম্মতি ও সদিচ্ছাকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও সব জায়গায় একইভাবে এ প্রথা পালিত হয়—এমন নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই।

পাপ-পুণ্যের ধারণা থেকে যে ব্যাখ্যা

এ রীতির সঙ্গে পাপ-পুণ্য নিয়ে একটি বহুল প্রচলিত লোকবিশ্বাস জড়িয়ে রয়েছে। বলা হয়, পুরুষেরা যৌনপল্লিতে গিয়ে নিজেদের পুণ্য সেখানে রেখে আসে এবং পাপ নিয়ে ফিরে যায়। এ ধারণা থেকেই যৌনপল্লির মাটিকে পুণ্যময় বলে বিবেচনা করা হয়—এমন একটি ব্যাখ্যা প্রচলিত আছে।

তবে এ বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সত্য বা সর্বজনস্বীকৃত শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি লোককথার মধ্য দিয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়া একটি ধারণা।

সমাজের প্রান্তিক মানুষেরও কি স্থান রয়েছে দেবীর কাছে?

যৌনপল্লির মাটি ব্যবহারের রীতিকে ঘিরে আলোচিত ব্যাখ্যাগুলোর একটি হলো সামাজিক অন্তর্ভুক্তি। সমাজের যে অংশকে নানা কারণে দূরে সরিয়ে রাখা হয়, তাদের বসতির মাটি দেবীর প্রতিমায় ব্যবহারের মধ্যে অনেকে সমতার প্রতীক খুঁজে পান।

দুর্গাকে মাতৃরূপে কল্পনা করা হয়। এ ধারণা থেকে অনেকে মনে করেন, দেবীর আরাধনায় সামাজিক পরিচয়ের কারণে কাউকে আলাদা করে দেখার কথা নয়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে যৌনপল্লির মাটির উপস্থিতি শুধু ধর্মীয় আচারের অংশ নয়, বরং সামাজিক বৈষম্য ও অবহেলা নিয়ে ভাবারও একটি উপলক্ষ।

তবে এ অর্থই যে প্রথাটির একমাত্র বা মূল ধর্মীয় ব্যাখ্যা, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। এর তাৎপর্য নিয়ে মানুষের বিশ্বাস ও ব্যাখ্যা ভিন্ন হতে পারে। তাই লোকাচার, ধর্মীয় বিশ্বাস ও আধুনিক সামাজিক ব্যাখ্যার মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি।

শিবকে ঘিরে প্রচলিত একটি লোককথা

যৌনপল্লির মাটি দুর্গাপ্রতিমা তৈরিতে ব্যবহারের কারণ ব্যাখ্যা করতে একটি জনপ্রিয় লোককথা প্রচলিত রয়েছে। কাহিনি অনুযায়ী, একবার কয়েকজন যৌনকর্মী গঙ্গায় স্নান করতে যাওয়ার পথে নদীর তীরে এক কুষ্ঠরোগীকে দেখতে পান। ওই ব্যক্তি গঙ্গাস্নানের জন্য সাহায্য চাইলেও অন্য কেউ এগিয়ে আসেননি।

তখন ওই নারীরা তাঁকে সাহায্য করতে এগিয়ে যান। লোককথার বর্ণনায়, ওই কুষ্ঠরোগী ছিলেন স্বয়ং শিব। নারীদের মানবিক আচরণে সন্তুষ্ট হয়ে তিনি নিজের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ করেন এবং তাঁদের বর চাইতে বলেন।

কাহিনি অনুসারে, নারীরা নিজেদের উঠোনের মাটি দিয়ে দুর্গাপ্রতিমা তৈরির বর চান। শিব তাঁদের সেই বর দেন। এ ঘটনার পর থেকেই গঙ্গার তীরের মাটির পাশাপাশি যৌনপল্লির আঙিনার মাটি দিয়ে দুর্গাপ্রতিমা তৈরির প্রথা চালু হয় বলে লোককথাটিতে দাবি করা হয়। তবে এ কাহিনির ঐতিহাসিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত নয়।

দেবী পুরাণের উল্লেখ ঘিরেও রয়েছে কাহিনি

আরেকটি প্রচলিত বর্ণনায় দেবী পুরাণের উল্লেখ করে বলা হয়, এক কিশোরী যৌনকর্মীকে দেবী স্বপ্নে দেখা দিয়ে আশ্বস্ত করেন। কাহিনির একটি সংস্করণে দেবী জানান, তাঁর পূজায় ওই কিশোরীর আঙিনার মাটি প্রয়োজন হবে।

এ গল্পের মধ্য দিয়ে সমাজের অবহেলিত মানুষের প্রতিও দেবীর মমতার ধারণা তুলে ধরা হয়। তবে কাহিনিটির নির্দিষ্ট শাস্ত্রীয় উৎস ও প্রামাণ্যতা যাচাই ছাড়া একে দেবী পুরাণের প্রতিষ্ঠিত বর্ণনা হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়।

ধর্মীয় আচার, নাকি সামাজিক বার্তা?

দুর্গাপ্রতিমায় যৌনপল্লির মাটি ব্যবহারের প্রথা নিয়ে ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি সামাজিক ব্যাখ্যাও গুরুত্ব পেয়েছে। কেউ একে প্রাচীন লোকাচারের অংশ হিসেবে দেখেন, আবার কেউ এর মধ্যে সমাজের প্রান্তিক মানুষের স্বীকৃতি ও মর্যাদার প্রতীক খুঁজে পান।

তবে এ রীতির প্রকৃত তাৎপর্য বুঝতে হলে প্রচলিত বিশ্বাস ও ঐতিহাসিক তথ্যের পার্থক্য মনে রাখা প্রয়োজন। যে ব্যাখ্যাই গ্রহণ করা হোক না কেন, প্রথাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে—ধর্মীয় উৎসবে যে সমাজ দেবীর আরাধনায় একত্র হয়, সেই সমাজে প্রান্তিক মানুষের মর্যাদা ও অধিকার কতটা নিশ্চিত?

সম্পাদকীয় :

সম্পাদক: শাকিলা জাহান
মোবাইল: ০১৩০১১০৪০৭০ ই-মেইল: info@gbanglanews.com

অফিস :

জি.এম বাংলা লিমিটেডের একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান।

৫৬-৫৭, শরীফ ম্যানশন, মতিঝিল রোড, ঢাকা-১০০০