ঢাকায় শক্তিশালী ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা

আপলোড সময় : ১৬-০৭-২০২৬ ০৭:৪২:৪৭ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ১৬-০৭-২০২৬ ০৭:৪৩:৩৯ অপরাহ্ন

রাজধানী ঢাকায় ৭ থেকে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পের ঝুঁকি রয়েছে বলে সতর্ক করেছেন ভূতাত্ত্বিক ও দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এ অঞ্চলের ভূমিকম্পের ৩০০ থেকে ৫০০ বছরের পুনরাবৃত্তির (রিটার্ন পিরিয়ড) চক্র প্রায় পূর্ণ হওয়ার পাশাপাশি সক্রিয় ফল্ট লাইনে দীর্ঘদিন ধরে চাপ সঞ্চিত থাকায় বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে ঠিক কবে এমন ভূমিকম্প ঘটবে, তা পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল অবকাঠামো, বিল্ডিং কোড অমান্য করে নির্মাণ এবং দুর্যোগ প্রস্তুতির ঘাটতির কারণে সম্ভাব্য বড় ভূমিকম্পে রাজধানীতে ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। সম্প্রতি ভেনিজুয়েলায় ৭ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পের পর ঢাকার ভূমিকম্পঝুঁকি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

গত ২১ নভেম্বর নরসিংদীর মাধবদীতে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় তীব্র কম্পন অনুভূত হয়। এতে কয়েকটি ভবন হেলে পড়ে এবং সারা দেশে ১০ জনের প্রাণহানি ঘটে। পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকটি অপেক্ষাকৃত কম মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, ছোট ছোট ভূমিকম্পকে বড় ভূমিকম্পের নিশ্চিত পূর্বাভাস বলা না গেলেও এগুলো ভূগর্ভস্থ টেকটোনিক কার্যকলাপের ইঙ্গিত বহন করে।

ভূতাত্ত্বিকদের মতে, বাংলাদেশ ইন্ডিয়ান, ইউরেশিয়ান ও বার্মা—এই তিনটি সক্রিয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত। ঢাকার কাছাকাছি মধুপুর ফল্ট এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ডাউকি ফল্ট দীর্ঘদিন ধরে বড় ধরনের শক্তি নির্গত না হওয়ায় সেখানে চাপ সঞ্চিত রয়েছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, ঢাকার বিস্তীর্ণ এলাকা জলাশয় ভরাট করে গড়ে উঠেছে। এসব এলাকার নরম মাটি বড় ধরনের ভূমিকম্পে তরল পদার্থের মতো আচরণ (লিকুইফ্যাকশন) করতে পারে, ফলে বহুতল ভবন দেবে যাওয়া বা হেলে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

তিনি বলেন, ভূমিকম্প কখন হবে তা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। তাই ক্ষয়ক্ষতি কমাতে এখনই প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। তার মতে, বড় ধরনের ভূমিকম্পে প্রাণহানির প্রায় ৯০ শতাংশই ভবন ধসের কারণে ঘটে। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিতে হবে।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রধান প্রকৌশলী মো. আমিনুর রহমান বলেন, ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমাতে নিয়মিত কোনো বিশেষ কার্যক্রম না থাকলেও নতুন ভবন যেন মানসম্মতভাবে নির্মিত হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

রাজউকের ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) অনুযায়ী, ঢাকা মহানগর ও আশপাশের এলাকায় প্রায় ২১ লাখ স্থাপনা রয়েছে। গবেষণা অনুযায়ী, ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে দুর্বল কাঠামোর প্রায় ৭২ হাজার ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়তে পারে এবং স্বল্প সময়ের মধ্যে ৩ থেকে ৪ লাখ মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া চারতলার বেশি উচ্চতার ভবনের প্রায় ৪০ শতাংশকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বড় ধরনের ভূমিকম্পে প্রায় সাড়ে আট লাখ ভবন আংশিক বা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, ঢাকার সবচেয়ে বড় দুর্বলতার মধ্যে রয়েছে জলাশয় ভরাট করে গড়ে ওঠা বসতি, বিল্ডিং কোড না মেনে ভবন নির্মাণ, সংকীর্ণ সড়ক, অতিরিক্ত জনঘনত্ব, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের নিয়মিত পরিদর্শনের অভাব, অপরিকল্পিত গ্যাস ও ইউটিলিটি লাইন এবং উদ্ধার সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা।

তাদের মতে, ভূমিকম্প প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও কার্যকর প্রস্তুতির মাধ্যমে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। এ জন্য জাতীয় ভবন নির্মাণ বিধিমালা (বিএনবিসি) কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, নতুন ভবনের ক্ষেত্রে মাটির লিকুইফ্যাকশন পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের রেট্রোফিটিং, উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ, কমিউনিটি পর্যায়ে প্রশিক্ষণ, ঢাকার বিকেন্দ্রীকরণ, পুরান ঢাকার সড়ক প্রশস্তকরণ এবং পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র ও উদ্ধার সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।

সম্পাদকীয় :

সম্পাদক: শাকিলা জাহান
মোবাইল: ০১৩০১১০৪০৭০ ই-মেইল: info@gbanglanews.com

অফিস :

জি.এম বাংলা লিমিটেডের একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান।

৫৬-৫৭, শরীফ ম্যানশন, মতিঝিল রোড, ঢাকা-১০০০