হাসিমুখের আড়ালে বিষণ্ণতা: স্মাইলিং ডিপ্রেশনে ভুগছেন না তো?

আপলোড সময় : ১৫-১০-২০২৬ ০১:২১:১৭ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ১৫-১০-২০২৬ ০১:২১:১৭ অপরাহ্ন

বিষণ্ণতা বলতে আমাদের মনে সাধারণত এমন একজন মানুষের ছবি ভেসে ওঠে, যিনি একা থাকেন, প্রায়ই কাঁদেন কিংবা দৈনন্দিন কাজ করার শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু বিষণ্ণতা কি সবার ক্ষেত্রে একইভাবে প্রকাশ পায়?

না। অনেক মানুষকে বাইরে থেকে হাসিখুশি দেখালেও তাঁরা ভেতরে ভেতরে তীব্র মানসিক কষ্টে ভুগতে পারেন। কর্মক্ষেত্রে সফল হওয়া, বন্ধুদের আড্ডায় রসিকতায় মেতে ওঠা কিংবা ব্যস্ত সামাজিক জীবন সামলানোর আড়ালেও লুকিয়ে থাকতে পারে বিষণ্ণতা। আপনার পরিচিত কেউ, এমনকি আপনিও অজান্তে এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন কি না, তা বুঝতে জেনে নিন ‘স্মাইলিং ডিপ্রেশন’-এর লক্ষণগুলো।

‘স্মাইলিং ডিপ্রেশন’ কী?

একজন মানুষকে বাইরে থেকে যতই হাসিখুশি দেখাক না কেন, ভেতরে ভেতরে তিনি বিষণ্ণতা ও হতাশায় ভুগতে পারেন। যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসিক স্বাস্থ্য গবেষক ড. অলিভিয়া রেমিস স্মাইলিং ডিপ্রেশনের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে এ বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

তাঁর মতে, এ সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিরা নিজেদের মানসিক অবস্থা আড়াল করতে একধরনের ‘মাস্কিং’ বা সামাজিক মুখোশ ব্যবহার করেন। ফলে আশপাশের মানুষ তাঁদের কষ্ট সহজে বুঝতে পারেন না।

মানুষ বিষণ্ণতা গোপন করেন কেন?

ড. রেমিস বলেন, অনেকেই বুঝতে পারেন না যে তাঁরা বিষণ্ণতায় ভুগছেন। তাঁদের মনে হতে পারে, বিষণ্ণতার লক্ষণগুলো ব্যস্ত ও চাপপূর্ণ জীবনযাপনেরই স্বাভাবিক অংশ।

আবার কিছু মানুষ, বিশেষ করে পারফেকশনিস্ট ও অতিরিক্ত কর্তব্যপরায়ণ ব্যক্তিরা, নিজেদের সমস্যার কথা স্বীকার করতে অস্বস্তি বোধ করেন। সামাজিক কলঙ্ক, অন্যের সমালোচনা কিংবা সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় তাঁরা নিজেদের কষ্ট লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করেন।

বিষণ্ণতা গোপন রাখার ঝুঁকি

বাইরে হাসিখুশি থাকলেও ভেতরে মানসিক কষ্ট চেপে রাখা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে। যুক্তরাজ্যের এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট অধ্যাপক বার্নি ডান বলেন, বিষণ্ণতা মানুষকে অন্যদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে এবং নিঃসঙ্গতার অনুভূতি বাড়াতে পারে। তাঁর মতে, মন খারাপ মোকাবিলায় অন্যদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

সমস্যাটি উপেক্ষা করলে বিষণ্ণতা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এটি আত্মহত্যার ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। তাই মানসিক কষ্টকে অবহেলা না করে প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা নেওয়া জরুরি।

স্মাইলিং ডিপ্রেশনের ৭টি লক্ষণ, যা সহজে চোখে পড়ে না

১. প্রিয় কাজের প্রতি আগ্রহ হারানো

যে শখ বা কাজগুলো একসময় আনন্দ দিত, সেগুলো হঠাৎ একঘেয়ে কিংবা অর্থহীন মনে হতে পারে।

২. শরীর ভারী লাগা

হাত-পা ভারী লাগা এবং চলাফেরা করতে কষ্ট হওয়ার মতো অনুভূতি দেখা দিতে পারে। বিষণ্ণতার সঙ্গে এ ধরনের শারীরিক উপসর্গও থাকতে পারে।

৩. শেষ মুহূর্তে পরিকল্পনা বাতিল করা

নিজের অনুভূতি আর আড়াল করতে না পেরে কেউ শেষ মুহূর্তে কোনো পরিকল্পনা বাতিল করতে পারেন কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা এড়িয়ে যেতে পারেন।

৪. অতিরিক্ত ঘুম ও ক্লান্তি

সারাদিন ঘুম ঘুম ভাব এবং শরীরে ক্লান্তি অনুভূত হতে পারে। ড. রেমিসের মতে, এ সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের দিনের শেষে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ঘুমের প্রয়োজন হতে পারে।

৫. অতিরিক্ত সংবেদনশীল হয়ে পড়া

সামান্য সমালোচনা কিংবা প্রত্যাখ্যানেও কেউ স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি কষ্ট পেতে পারেন। ছোট ঘটনাও তাঁদের মনে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।

৬. সবসময় হাসিখুশি থাকার চেষ্টা

নিজের কষ্ট আড়াল করতে কেউ অতিরিক্ত হাসিখুশি বা রসিক মানুষ হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করতে পারেন। আড্ডার প্রাণকেন্দ্র হয়ে থাকা কিংবা অতিরিক্ত কাজে ডুবে থাকার মাধ্যমেও তাঁরা নিজেদের অনুভূতি থেকে মনোযোগ সরানোর চেষ্টা করতে পারেন।

৭. নিজের যোগ্যতা নিয়ে ক্রমাগত সন্দেহ

নিজের কাজ ও যোগ্যতা নিয়ে বারবার সন্দেহ তৈরি হতে পারে। একপর্যায়ে নিজেকে মূল্যহীন বা ভেতরে ভেতরে শূন্য মনে হতে পারে।

তবে এসব লক্ষণ একা স্মাইলিং ডিপ্রেশন নিশ্চিত করে না। দীর্ঘদিন ধরে এমন উপসর্গ দেখা দিলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

উত্তরণের উপায় কী?

অধ্যাপক বার্নি ডানের পরামর্শ, নিজের অনুভূতি আর লুকিয়ে না রেখে বিশ্বস্ত কারও সঙ্গে সেগুলো ভাগ করে নেওয়া উচিত। মানসিক কষ্ট গুরুতর হলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন।

তাঁর মতে, কথা বলা, বিষণ্ণতারোধী ওষুধ এবং সামাজিক চিকিৎসাসহ বিভিন্ন পদ্ধতি কার্যকর হতে পারে বলে জোরালো প্রমাণ রয়েছে। তবে কোন পদ্ধতি উপযুক্ত হবে, তা ব্যক্তির অবস্থা অনুযায়ী নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

মনে রাখতে হবে, বাইরে হাসিখুশি থাকা মানেই কেউ মানসিকভাবে ভালো আছেন, এমন নয়। নিজের বা কাছের কারও মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক কষ্টের লক্ষণ দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নেওয়া জরুরি।

তথ্যসূত্র: বিবিসি

সম্পাদকীয় :

সম্পাদক: শাকিলা জাহান
মোবাইল: ০১৩০১১০৪০৭০ ই-মেইল: info@gbanglanews.com

অফিস :

জি.এম বাংলা লিমিটেডের একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান।

৫৬-৫৭, শরীফ ম্যানশন, মতিঝিল রোড, ঢাকা-১০০০