ঢাকার আশুলিয়ায় একটি রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানায় কর্মরত অবস্থায় এক নারী শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। প্রকাশিত সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, মেশিনে কাজ করার সময় এক পুরুষ কর্মকর্তা ওই শ্রমিকের দিকে বারবার তেড়ে যাচ্ছেন, মেশিনে আঘাত করছেন এবং তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করছেন। একপর্যায়ে মেশিনে বসা অবস্থায় মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন ওই শ্রমিক। পরে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। অভিযোগ উঠেছে, অসুস্থ বোধ করায় তিনি কারখানা কর্তৃপক্ষের কাছে ছুটি চাইলেও তা পাননি।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বিকেলে তৈরি পোশাকশিল্প গ্রুপ ডেকো গ্রুপের প্রতিষ্ঠান আগামী অ্যাপারেলস লিমিটেডে এ ঘটনা ঘটে।
নিহত শ্রমিকের নাম মিশু আক্তার (২৬)। তাঁর গ্রামের বাড়ি নীলফামারী জেলার ডিমলা থানায়। স্বামী সাজ্জাদ হোসেন ও দুই ছেলেকে নিয়ে তিনি আশুলিয়ার কাঠগড়া নয়াপাড়া এলাকার একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। তিনি আগামী অ্যাপারেলস লিমিটেডে সুইং অপারেটর হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
সিসিটিভি ফুটেজে যা দেখা গেছে
প্রকাশিত সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, অন্য শ্রমিকদের মতো মিশু আক্তারও সুইং মেশিনে কাজ করছিলেন। একপর্যায়ে তাঁর পাশে একজন ব্যক্তি আসেন। এরপর আরেক ব্যক্তি মিশুর দিকে তেড়ে যান। তিনি সুইং মেশিনে আঘাত করতে থাকেন এবং কয়েক দফায় উদ্ধত অঙ্গভঙ্গি করেন। মিশুর কাজের কাপড় ছিনিয়ে নিয়ে নিচে ফেলে দেন ওই ব্যক্তি। এর কিছুক্ষণ পর মিশু মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন।
ফুটেজে দেখা যায়, বিকেল ৫টা ১ মিনিট ৩৪ সেকেন্ডে মেশিনে কাজ করার সময় মিশু লুটিয়ে পড়েন। এ সময় মেশিনে আঘাত করা ও উদ্ধত অঙ্গভঙ্গি করা ব্যক্তিকে কিছুটা দূরে সরে গিয়ে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
একজন নারী শ্রমিক মিশুকে তোলার চেষ্টা করেন। পরে আশপাশের আরও কয়েকজন নারী শ্রমিক এগিয়ে আসেন। ওই ব্যক্তিকে মিশুর মাথার কাছ থেকে একটি বস্তু দূরে ছুড়ে ফেলতে দেখা যায়। এরপর তিনি সেখান থেকে চলে যান। নারী শ্রমিকেরা মিশুকে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যান। বিকেল ৫টা ৩ মিনিট ৪৯ সেকেন্ডে তাঁরা একটি স্ট্রেচার নিয়ে ফিরে আসেন। পরে মিশুকে স্ট্রেচারে করে ফ্লোর থেকে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়।
হাসপাতাল ও পরিবারের বক্তব্য
নারী ও শিশু হাসপাতালের সিনিয়র ম্যানেজার (অপারেশন) হারুন-অর-রশীদ জানান, আগামী অ্যাপারেলস থেকে সুমি আক্তার মিশু নামের ওই নারী শ্রমিককে অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল। চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। এ সময় তাঁর স্বামী সাজ্জাদ হোসেন ও কারখানা কর্তৃপক্ষ হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন।
তিনি জানান, নিহতের স্বামী কোনো অভিযোগ নেই বলে জানিয়েছিলেন এবং মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। পরে মৃত্যু সনদ দিয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষ ও স্বামীর কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়।
হারুন-অর-রশীদ আরও বলেন, মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতাল থেকে বের করার সময় কারখানার কয়েকজন শ্রমিক বাধা দেন। এ সময় নিহতের স্বামী ও স্বজনেরা অ্যাম্বুলেন্স থেকে নেমে পড়েন। এর মধ্যেই কারখানা কর্তৃপক্ষ মরদেহ নিয়ে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যায়। পরে আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফোন করে মরদেহ থানায় নিয়ে যেতে বলেন। এরপর অ্যাম্বুলেন্সচালককে ফোন করে মরদেহ আশুলিয়া থানায় নিতে বলা হয়।
মিশুর স্বামী সাজ্জাদ হোসেন বলেন, “গতকাল (শুক্রবার) দুপুরে বিরতির সময় মিশু বাসায় খেতে আসে। খাওয়া শেষে আবার অফিসে যায়। আমি এ সময় বাসায়ই ছিলাম। সে অসুস্থ ছিল না। অসুস্থ বললে তো অফিসেই যাইতে দিতাম না।”
তিনি আরও বলেন, “এখন আমি কোনো কাজ করি না। ঠিক করছিলাম মোবাইলের সার্ভিসিংয়ের দোকান দিবো। এর আগেই এই ঘটনা ঘটলো। ফুটেজে যা দেখা গেছে, এইটা একধরনের নির্যাতন। শরীরে হাত তোলা ব্যতীত যা বলার, করার সব করছে। ৫টা ১০-১২ মিনিটের দিকে খবর পেয়ে ফ্যাক্টরিতে গেছিলাম। পরে আশুলিয়ার নারী ও শিশু হাসপাতালে নিলে ডাক্তার বলে মারা গেছে। আমি বিচার চাই।”
শ্রমিক সংগঠনের অভিযোগ
বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু সিসিটিভি ফুটেজ, নিহতের স্বজন ও সহকর্মীদের বরাত দিয়ে জানান, শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন হলেও কারখানায় উৎপাদন চলছিল। সুমি অসুস্থ শরীর নিয়েই কাজে যোগ দিয়েছিলেন। দুপুরে বাসায় খেতে গিয়ে তিনি ছেলেকে নিজের অসুস্থতা ও কারখানায় কাজের চাপের কথা জানিয়েছিলেন।
মিন্টু বলেন, সুমি জানিয়েছিলেন, তাঁর শরীর খারাপ লাগছিল এবং কারখানায় কাজের চাপ অনেক বেশি ছিল। তিনি ছুটি চাইলেও ছুটি দেওয়া হয়নি। খাবার খেয়ে তাঁকে আবার কারখানায় ফিরতে হয়।
তিনি আরও বলেন, সাপ্তাহিক ছুটির দিন সুমির বাসায় থাকার কথা থাকলেও তাঁকে কারখানায় কাজ করতে হচ্ছিল। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, অসুস্থ অবস্থায় কাজ করতে গিয়ে তিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারছিলেন না বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাঁর কর্মঘণ্টা শেষ হওয়ার পরও তাঁকে কাজ করতে হচ্ছিল।
মিন্টুর ভাষ্য অনুযায়ী, বিকেল ৫টা ১ মিনিট ১৪ সেকেন্ডের দিকে এক কর্মকর্তা মিশুর দিকে তেড়ে যান এবং তাঁর সঙ্গে বারবার খারাপ আচরণ করেন। এ সময় তিনি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন বলে অভিযোগ করেন মিন্টু। এর মধ্যেই মেশিনে বসা অবস্থায় মিশু লুটিয়ে পড়েন। পরে কারখানার মেডিকেল সেন্টারে তাঁর মৃত্যু হয় এবং মরদেহ নারী ও শিশু হাসপাতালে নেওয়া হয়।
সুপারভাইজার সাময়িক বরখাস্ত
ঘটনার পর সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট ফ্লোরের লাইন সুপারভাইজারের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ। তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার পাশাপাশি সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
ডেকো গ্রুপের জিএম (অ্যাডমিন, এইচআর অ্যান্ড কমপ্লায়েন্স) মো. সালাউদ্দিন বলেন, “ইতিমধ্যে ওই সুপারভাইজারকে শোকজ ও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। নিয়মতান্ত্রিকভাবে চূড়ান্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। মিশুর পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে তাঁর সব পাওনা দ্রুত সময়ের মধ্যে পরিশোধ করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “মিশুর সহকর্মীরা জানিয়েছেন, স্বামী-সন্তানদের নিয়ে চিন্তিত ছিলেন মিশু। স্বামী কোনো কাজের সঙ্গে যুক্ত না থাকায় স্বাভাবিকভাবেই হয়তো চিন্তিত ছিলেন। শুনেছি মৃত্যুর ঘটনায় মামলার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে মিশুর পরিবারকে যৌক্তিক সব বিষয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।”
ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ পাঠানো হয়েছে
আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম জানান, খবর পেয়ে নারী ও শিশু হাসপাতাল থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে রাতেই ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
এ ঘটনায় মিশুর স্বামী লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। পরবর্তী আইনগত কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানান ওসি।