অভাব জয় করে দুর্গাপুর এখন ‘হাঁসের গ্রাম’

আপলোড সময় : ১৯-১০-২০২৬ ১২:২৯:২৪ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ১৯-১০-২০২৬ ১২:২৯:২৪ অপরাহ্ন

পিরোজপুর শহর থেকে কয়েক কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত নিভৃত এক গ্রাম দুর্গাপুর। চারদিকে বিস্তৃত খাল-বিল, নালা ও প্রাকৃতিক জলাশয়ে সমৃদ্ধ এই গ্রামে একসময় অভাব-অনটন ছিল নিত্যসঙ্গী। সময়ের ব্যবধানে সেই চিত্র বদলে গেছে। প্রকৃতির দেওয়া পানি ও প্রাকৃতিক খাবারকে পুঁজি করে বাণিজ্যিকভাবে হাঁস পালন শুরু করেন এলাকার মানুষ। কঠোর পরিশ্রম ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে গ্রামটি এখন পুরো পিরোজপুর জেলায় পরিচিতি পেয়েছে ‘হাঁসের গ্রাম’ হিসেবে।

একটি গ্রামের দুই শতাধিক পরিবারের হাঁস পালন করে স্বাবলম্বী হওয়ার এমন দৃষ্টান্ত দেশে বেশ বিরল। গ্রামজুড়ে ছোট-বড় মিলিয়ে গড়ে উঠেছে দুই শতাধিক হাঁসের খামার। এসব খামার থেকে প্রতিদিন উৎপাদিত হচ্ছে হাজার হাজার ডিম। ডিম ও হাঁসের বাচ্চা বিক্রি করে এখানকার পরিবারগুলোতে এসেছে আর্থিক স্বচ্ছলতা। প্রতি মাসে গ্রামটিতে ডিম ও বাচ্চা বিক্রি থেকে আয় হচ্ছে কয়েক লাখ টাকা। অনেক খামারির মাসিক নিট আয় লাখ টাকারও বেশি।

দুর্গাপুর গ্রামের সফল খামারিদের একজন সায়েম হাওলাদার। লেখাপড়ার পাশাপাশি আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার গল্প শোনান তিনি। সায়েম জানান, এসএসসি পরীক্ষা শেষ করার পর অবসর সময়ে হাঁস পালনের সিদ্ধান্ত নেন। শুরুটা খুব সহজ ছিল না। মাত্র ৫০টি হাঁস নিয়ে খামারের যাত্রা শুরু করেন তিনি।

নিবিড় পরিচর্যা, সঠিক যত্ন ও নিজের মেধা কাজে লাগিয়ে বর্তমানে সায়েমের খামারে রয়েছে প্রায় ৮০০ হাঁস। তিনি বলেন, “পরীক্ষার পর বসে না থেকে অল্প কিছু হাঁস দিয়ে শুরু করেছিলাম। হাঁসগুলো মুক্ত জলাশয়ে চরে বেড়ায়, তাই অতিরিক্ত কৃত্রিম খাবারের খরচ অনেক কম হয়। বর্তমানে ডিম ও বাচ্চা বিক্রি করে আমি পুরোপুরি স্বাবলম্বী। পরিবারের খরচ চালিয়ে ভালো অঙ্কের টাকা সঞ্চয়ও করতে পারছি।”

সায়েম হাওলাদারের মতো একই গ্রামের জোবায়ের, শফিক, আরিফসহ দুই শতাধিক খামারি এখন স্বাবলম্বী। যাঁদের একসময় দিন এনে দিন চলত, তাঁরা আজ নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন। পাশাপাশি এলাকার আরও অনেকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছেন।

দুর্গাপুর গ্রামে বাণিজ্যিক সম্ভাবনা বাড়লেও খামারিদের দুশ্চিন্তাও রয়েছে। স্থানীয় খামারিরা জানান, গত বছরের তুলনায় চলতি বছর বাজারে ডিমের দাম কিছুটা কমেছে। অন্যদিকে হাঁসের জন্য প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত ওষুধ ও সম্পূরক খাদ্যের দাম দিন দিন বাড়ছে। উৎপাদিত ডিমের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় গত বছরের তুলনায় মুনাফা কমেছে। এতে তাঁরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

খামারিদের সবচেয়ে বড় অভিযোগ, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও আধুনিক চিকিৎসাসেবার অভাব। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বড় পরিসরে হাঁস পালন করা হলেও তাঁরা আধুনিক প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক খামার ব্যবস্থাপনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত।

খামারিদের ভাষ্য, ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রায়ই খামারে বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। এলাকায় আধুনিক প্রাণিচিকিৎসাকেন্দ্র বা পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকায় সময়মতো রোগ শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে অনেক সময় হঠাৎ হাঁস মারা যায় এবং খামারিরা বড় ধরনের আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েন।

খামারিরা বলেন, “আমরা যদি সঠিক সময়ে সরকারি প্রশিক্ষণ পেতাম এবং খামারের কাছেই প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য হতো, তবে ক্ষতির ঝুঁকি অনেক কমে যেত। এ ছাড়া সরকারি ব্যবস্থাপনায় সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা গেলে খামারগুলোর পরিধি আরও বাড়ানো সম্ভব হতো।”

পিরোজপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. তরুণ কুমার সিকদার জানান, দুর্গাপুরের খামারিদের সাফল্য পিরোজপুরের সামগ্রিক প্রাণিসম্পদ খাতের জন্য বড় অনুপ্রেরণা।

তিনি বলেন, দুর্গাপুরে বাণিজ্যিকভাবে হাঁস পালন আরও সহজ ও লাভজনক করতে জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পক্ষ থেকে খামারিদের নিয়মিত পরামর্শ ও চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। খামারিরা যাতে রোগবালাইয়ের কারণে হঠাৎ ক্ষতির মুখে না পড়েন, সে জন্য প্রতিষেধক টিকাদান কার্যক্রম ও নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি বাণিজ্যিক সুবিধা বাড়াতে খামারিদের কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়ার বিষয়েও বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

সম্পাদকীয় :

সম্পাদক: শাকিলা জাহান
মোবাইল: ০১৩০১১০৪০৭০ ই-মেইল: info@gbanglanews.com

অফিস :

জি.এম বাংলা লিমিটেডের একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান।

৫৬-৫৭, শরীফ ম্যানশন, মতিঝিল রোড, ঢাকা-১০০০