জামালপুরে ইয়াবার বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। জেলা শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম ও চরাঞ্চল পর্যন্ত মাদকটির সহজলভ্যতার অভিযোগ উঠেছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে স্কুল-কলেজের কিশোর ও তরুণেরা। কৌতূহল, বন্ধুদের প্ররোচনা, গ্যাং সংস্কৃতি এবং পারিবারিক তদারকির ঘাটতি কাজে লাগিয়ে তাদের একটি অংশ মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
মাদক কারবারিরা সরাসরি বিক্রির পাশাপাশি মোবাইল ফোনে যোগাযোগ ও অন-কল ডেলিভারির মাধ্যমে ইয়াবা সরবরাহ করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় সহজে ইয়াবা পাওয়া যায় বলে দাবি করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, মাদক নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, জামালপুরে একসময় গাঁজা ও ফেনসিডিলের ব্যবহার বেশি আলোচিত হলেও গত চার-পাঁচ বছরে ইয়াবার বিস্তার বেড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে পরিবার ও সমাজে। মাদক কেনার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে চুরি, ছিনতাই, পারিবারিক সহিংসতা ও অন্যান্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনাও ঘটছে বলে তাঁদের অভিযোগ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জামালপুর শহরের একটি কলেজের একাদশ শ্রেণির এক শিক্ষার্থী জানান, এক বড় ভাই ও বন্ধুর প্ররোচনায় কৌতূহল থেকে প্রথমবার ইয়াবা সেবন করেন তিনি। তখন তিনি প্রেমে ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। পরিচিতরা বিনা মূল্যে ইয়াবা দিয়ে তাঁকে বলেছিল, এটি সেবন করলে পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়ে এবং মেজাজ ভালো থাকে। প্রথমবার সেবনের পরিণতি সম্পর্কে ধারণা না থাকলেও দুই-তিন দিনের মধ্যেই পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পারেন বলে জানান ওই শিক্ষার্থী।
তাঁর ভাষ্য, পরে ইয়াবা না পেলে মানসিক অস্বস্তি হতো। একপর্যায়ে প্রতিদিন এক থেকে দুটি ইয়াবা সেবনের অভ্যাস তৈরি হয়। জামালপুর শহরের বিভিন্ন গলি ও মোড়ে মানভেদে প্রতিটি ইয়াবা ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি হয় বলেও দাবি করেন তিনি। মাদক কেনার টাকা জোগাড় করতে পরিবারের কাছে বিভিন্ন অজুহাত দেখাতেন। তাঁর হিসাবে, প্রতিদিন ইয়াবার পেছনে ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতো।
ইয়াবা সংগ্রহের বিষয়ে ওই শিক্ষার্থী বলেন, শহরের নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় ফোন বা বার্তা পাঠালে মোটরসাইকেলে করে ইয়াবা পৌঁছে দেওয়া হয়। তবে সবার কাছে সরাসরি বিক্রি করা হয় না; পরিচিত কারও মাধ্যমে যোগাযোগ তৈরি করতে হয়। নিজের মতো আরও অনেক সহপাঠী ও ছোট ভাই মাদকে জড়িয়ে পড়ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। বর্তমানে এ অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছেন বলেও জানান।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জামালপুর পৌর এলাকার বিভিন্ন অলিগলিতে সন্ধ্যার পর কিশোর ও তরুণদের সন্দেহজনক আড্ডা বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে মাদক কারবারিরা সরাসরি বিক্রির বদলে ফোনে যোগাযোগ ও সরবরাহের পদ্ধতি ব্যবহার করছে। নির্দিষ্ট মোবাইল আর্থিক সেবার নম্বরে টাকা পাঠিয়ে কিংবা পরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে সংকেত দিয়ে মাদক সংগ্রহের অভিযোগও রয়েছে।
শহরের বাইরেও মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, মেলান্দহ, মাদারগঞ্জ, ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, বকশীগঞ্জ ও সরিষাবাড়ীর বিভিন্ন গ্রামেও ইয়াবা ছড়িয়ে পড়েছে। চায়ের দোকান, নির্জন স্থান ও বাঁশঝাড়কেন্দ্রিক আড্ডায় তরুণদের উপস্থিতি নিয়েও তাঁরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
মাদক পরিবহনে কারবারিরা নিয়মিত পথ পরিবর্তন করে বলে স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ। সীমান্তঘেঁষা শেরপুরের কয়েকটি এলাকা দিয়ে মাদক জামালপুরে প্রবেশ করে বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।
উদ্ধার নিয়ে দুই সংস্থার পরিসংখ্যান
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত জামালপুর জেলায় সংস্থাটির ৯৩৪টি অভিযানে ৫ হাজার ৩৬৬ পিস ইয়াবা, ১২ গ্রাম ইয়াবার গুঁড়া এবং ১ হাজার ২০৫টি ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়েছে।
তবে মাদকের সহজলভ্যতার অভিযোগের তুলনায় উদ্ধার হওয়া ইয়াবার পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকেরা। তাঁদের মতে, বিচ্ছিন্ন অভিযান চালানোর পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থা, বিক্রয়কেন্দ্র ও এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে ধারাবাহিক অভিযান প্রয়োজন।
জেলা পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত জেলায় মাদকসংক্রান্ত ১ হাজার ৪১৮টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ২ হাজার ১৮৪ জনকে। এ সময়ে ৫৯ হাজার ১০৯ পিস ইয়াবা, ৩১২ কেজি ৬৮৬ গ্রাম গাঁজা, ৯৮৯ গ্রাম হেরোইন ও ১ হাজার ৪৮০ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া ৫ হাজার ৪৭৯ পিস ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেটসহ অন্যান্য মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়। পুলিশের হিসাবে, উদ্ধার করা মাদকদ্রব্যের মোট আনুমানিক মূল্য ৩ কোটি ৪২ লাখ ৭২ হাজার ৪৬০ টাকা।
পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধু ২০২৫ সালে ৪২ হাজার ৮৫৪ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে উদ্ধার হয়েছে ১৬ হাজার ২৫৫ পিস।
গত বছরের ২৫ অক্টোবর জামালপুর সদর উপজেলায় আনন্দভ্রমণের একটি বাসে তল্লাশি চালিয়ে ২২ হাজার পিস ইয়াবাসহ এক দম্পতিকে গ্রেপ্তার করার তথ্যও জানিয়েছে পুলিশ। উদ্ধার করা ইয়াবার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৬৬ লাখ টাকা বলে পুলিশের দাবি।
মাদকবিরোধী অভিযানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটছে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় মেলান্দহ উপজেলার শ্যামপুর ইউনিয়নের ২ নম্বর চর এলাকায় মাদক মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি এনামুল হককে (৩০) গ্রেপ্তার করতে গিয়ে পুলিশের চার সদস্য হামলার শিকার হন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মেলান্দহ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) হিমন, সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আওয়াল, এএসআই আবু রায়হান ও কনস্টেবল আবু তাহের এনামুলকে গ্রেপ্তার করতে গেলে তিনি ও তাঁর স্বজনেরা পুলিশের ওপর চড়াও হন। এ সময় ধস্তাধস্তিতে এসআই হিমনের হাতে আঘাত লাগে।
‘চোখের সামনে একটা প্রজন্ম শেষ হয়ে যাচ্ছে’
জামালপুর পৌর এলাকার বাসিন্দা মো. তোফাজ্জল হোসেন বলেন, সন্ধ্যার পর পাড়া-মহল্লার অলিগলিতে উঠতি বয়সের ছেলেদের দলবদ্ধ আড্ডা নিয়ে বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। এসব জায়গায় কী ধরনের লেনদেন হয়, তা নিয়ে মানুষের সন্দেহ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তোফাজ্জল হোসেন বলেন, সন্তান মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় অভিভাবকেরা আতঙ্কে থাকেন। তাঁর মতে, মাদক বিক্রির নির্দিষ্ট স্থানগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
মানবাধিকারকর্মী ও সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সাবেক সভাপতি জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, জামালপুরে ইয়াবার বিস্তার শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটি গুরুতর সামাজিক সংকট। তাঁর মতে, শুধু ছোট কারবারিদের গ্রেপ্তার করে এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যাবে না; মাদক সরবরাহের সঙ্গে জড়িত মূল ব্যক্তিদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।
তিনি সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবার ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে মাদকাসক্ত তরুণদের চিকিৎসার জন্য সরকারি উদ্যোগে পর্যাপ্ত নিরাময়কেন্দ্র স্থাপনের ওপর গুরুত্ব দেন।
সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ হারুনুর রশিদ বলেন, তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে পড়াশোনায় অনীহা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত আসক্তি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত উপস্থিতি কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তাঁর মতে, ইয়াবার সহজলভ্যতাও তরুণদের মাদকের দিকে আকৃষ্ট হওয়ার অন্যতম কারণ।
শিক্ষাব্যবস্থার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, অটোপাস, সংক্ষিপ্ত সিলেবাস ও সহজ মূল্যায়ন পদ্ধতির কারণে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমার পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ
জামালপুর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক বিদ্যুৎ বিহারী তথ্য দিলেও এ বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দিতে রাজি হননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ রুহুল আমিনের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) ইয়াহিয়া আল মামুন বলেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সীমান্ত দিয়ে মাদক দেশে প্রবেশ করে বলে তাঁরা মনে করেন। সীমান্ত এলাকায় পুলিশের প্রবেশাধিকারের সীমাবদ্ধতার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, সীমান্তে নজরদারি জোরদার করার পাশাপাশি মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে।
ইয়াহিয়া আল মামুন আরও বলেন, তরুণদের খেলাধুলা ও সৃজনশীল কাজে সম্পৃক্ত করা এবং মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন।
জামালপুরে ইয়াবার বিস্তার ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান, মাদকের সরবরাহব্যবস্থা শনাক্ত, চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ এবং পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন নাগরিকেরা। তাঁদের মতে, তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে প্রতিরোধের পাশাপাশি আসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগও বাড়াতে হবে।