ব্যস্ত কর্মজীবন, দীর্ঘ যানজট, সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা ওজন কমানোর উদ্দেশ্যে অনেকেই রাতের খাবার এড়িয়ে চলেন। আবার কেউ কেউ ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের অংশ হিসেবে নির্দিষ্ট সময়ের পর আর খাবার গ্রহণ করেন না। তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, মাঝে মধ্যে রাতের খাবার বাদ দিলে সাধারণত বড় ধরনের সমস্যা না হলেও এটি নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হলে শরীর ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাতের খাবার শরীরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ঘুমের সময় দীর্ঘ সময় ধরে শরীর খাবার ছাড়া থাকে। তাই ঘুমের আগে পরিমিত ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ শরীরকে প্রয়োজনীয় শক্তি ও পুষ্টি জোগাতে সহায়তা করে। পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একসঙ্গে রাতের খাবার খাওয়ার অভ্যাস সামাজিক ও মানসিক সুস্থতার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
২০২১ সালে আমেরিকান কলেজ অব পেডিয়াট্রিশিয়ানস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত রাতের খাবার খাওয়ার অভ্যাস শিশুদের পুষ্টি, শিক্ষাগত সাফল্য এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখতে সহায়ক।
রাতের খাবার বাদ দিলে অনেকের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় সবজি ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারের পরিমাণও কমে যেতে পারে। বিশেষ করে যারা দিনের অন্যান্য সময়ের তুলনায় রাতে বেশি পরিমাণে সবজি খান, তাদের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পুষ্টি গ্রহণে ঘাটতি দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে।
শরীরে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে?
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, খাবারের সময়সূচিতে বড় ধরনের পরিবর্তন শরীরের জৈবঘড়ি (সার্কাডিয়ান রিদম) ও ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।
২০২৩ সালে জার্নাল অব দ্য অ্যাকাডেমি অব নিউট্রিশন অ্যান্ড ডায়েটেটিকস-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় দিনে মাত্র একবার খাবার খাওয়ার অভ্যাসের সঙ্গে মৃত্যুঝুঁকি বৃদ্ধির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। একই গবেষণায় নিয়মিত দুপুর বা রাতের খাবার বাদ দেওয়ার সঙ্গে হৃদ্রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধির সম্পর্কও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ ধরনের গবেষণা সম্পর্ক (association) নির্দেশ করে, সরাসরি কারণ (causation) প্রমাণ করে না।
নিয়মিত রাতের খাবার না খেলে রক্তে শর্করার মাত্রায় ওঠানামা হতে পারে। এতে দুর্বল লাগা, ক্লান্তি, হাত কাঁপা বা শক্তি কমে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
অন্যদিকে, ২০২২ সালে সেল মেটাবলিজম সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, গভীর রাতে খাবার খাওয়ার অভ্যাস ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে ওজন বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
এ ছাড়া ইনোভেশন ইন এজিং সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষ করে বয়স্কদের মধ্যে নিয়মিত খাবার বাদ দেওয়ার সঙ্গে বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও অনিদ্রার মতো সমস্যার সম্পর্ক থাকতে পারে।
কী করবেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাঝে মধ্যে কোনো কারণে রাতের খাবার বাদ পড়লে সাধারণত উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে এটি যেন নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত না হয়, সেদিকে নজর রাখা জরুরি। আর ওজন নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য থাকলে রাতের খাবার সম্পূর্ণ বাদ না দিয়ে পরিমিত ও সুষম খাদ্য গ্রহণ এবং নিয়মিত শরীরচর্চা করাই স্বাস্থ্যকর উপায়।