রাজধানীর লালবাগ রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে মিস কেসের নকল দেওয়ার কথা বলে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে রাশেদ নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। সরকারি ফি ২০ টাকা হলেও একটি নকলের জন্য ১ হাজার ৯০০ টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সেবাগ্রহীতা। তবে অভিযুক্ত রাশেদ দাবি করেছেন, তিনি ১ হাজার ৫০০ টাকা নিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার দুপুরে কার্যালয়ের নিচতলায় সিঁড়ির পাশে নকল হস্তান্তর ও টাকা লেনদেনের দৃশ্য ধারণ করেন দৈনিক যুগান্তরের প্রতিবেদক। টাকা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে রাশেদ বলেন, নামজারিসংক্রান্ত কাজের জন্য তিনি ১ হাজার ৯০০ টাকা নিয়েছেন। এ ঘটনার ভিডিও ফুটেজ প্রতিবেদকের কাছে রয়েছে বলে জানিয়েছে যুগান্তর।
নকলের বিনিময়ে টাকা আদায়ের অভিযোগ
যুগান্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়, বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টা থেকে কাঁটাবনে অবস্থিত লালবাগ রাজস্ব সার্কেল ভূমি কার্যালয়ে অনুসন্ধান চালানো হয়। এ সময় রাশেদকে অফিসের বিভিন্ন স্থানে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। তাঁর হাতে ছিল সরকারি প্যাড।
দুপুর ১২টা ৪ মিনিটে কার্যালয়ের নিচতলায় সিঁড়ির পাশে লালবাগের বাসিন্দা মো. উজ্জ্বলের হাতে একটি মিস কেসের নকল তুলে দেন রাশেদ। এরপর তাঁদের মধ্যে টাকা লেনদেন হয়।
উজ্জ্বলের অভিযোগ, জমিসংক্রান্ত একটি মিস কেসের নকল নিতে গেলে রাশেদ নিজেকে ভূমি অফিসের লোক পরিচয় দিয়ে নকলটি তুলে দেওয়ার কথা বলেন। প্রথমে ১ হাজার ৫০০ টাকা দিতে চাইলে রাশেদ তা নিতে রাজি হননি। পরে ১০০ টাকা করে কয়েক দফায় অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে মোট ১ হাজার ৯০০ টাকা দিতে হয় তাঁকে।
অথচ ওই নকলের সরকারি ফি ২০ টাকা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দালালচক্রের অভিযোগ
ভূমি অফিসের একাধিক কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রায় ১০ বছর ধরে রাশেদ এ কার্যালয়ে যাতায়াত করছেন। লালবাগ ছাড়াও ধানমন্ডি, নিউমার্কেট ও তেজগাঁওয়ের বিভিন্ন সার্কেল অফিসে জমিসংক্রান্ত কাজ করিয়ে দেওয়ার নামে তিনি দালালি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, কার্যালয়ের তৃতীয় তলায় কম্পিউটার-সংক্রান্ত কাজ করা সুমন এবং ক্যাশিয়ার হিসেবে পরিচিত ওমেদার রাসেলও জমিসংক্রান্ত কাজে যুক্ত। রাসেলের কাঁটাবনে পাঠক সমাবেশ ভবনের তৃতীয় তলায় ভাড়া করা একটি অফিস রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। এর আগে তিনি আজিমপুরের লালবাগ তহশিল অফিসে কাজ করতেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জহিরুল ইসলাম নামে আরেক ব্যক্তির বিরুদ্ধে গ্রাহকদের কর্মচারী পরিচয় দিয়ে বাইরে নিয়ে বিভিন্ন কর্মকর্তার মাধ্যমে ফাইলের কাজ করিয়ে দেওয়ার সমঝোতা করার অভিযোগ করেছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
একাধিক সেবাগ্রহীতার অভিযোগ, অতিরিক্ত অর্থ না দিলে নির্ধারিত সময়ে ফাইল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অনিয়মের খবর প্রকাশ হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কিছুদিন আড়ালে থাকেন, পরে আবার অফিসে আসেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
নকলের উৎস নিয়ে দুই বক্তব্য
অফিস সূত্রের দাবি, মিস কেসের নকলের সঙ্গে মিউটেশন শাখার মিস কেস সহকারী ও নাজিরের দায়িত্বে থাকা এসএম আরিফুর রহমানের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তবে আরিফুর রহমান প্রথমে রাশেদকে চেনেন না বলে জানান।
ভিডিও দেখানোর পর তিনি বলেন, রাশেদ স্টেশনারি ও দলিল-সংক্রান্ত স্ট্যাম্পসহ বিভিন্ন কাজ করেন এবং মাঝেমধ্যে অফিসে আসেন। উজ্জ্বলের নকলটি তাঁর কাছ থেকে নেওয়া হয়নি বলেও দাবি করেন আরিফুর রহমান।
অন্যদিকে, রাশেদ দাবি করেন, নকলটি তিনি আরিফুর রহমানের কাছ থেকেই নিয়েছেন, তবে এ জন্য তাঁকে কোনো টাকা দেননি। এ বিষয়ে দুজনের বক্তব্যে অমিল রয়েছে।
পরে রাশেদ বলেন, নকল দেওয়ার বিনিময়ে তিনি ১ হাজার ৫০০ টাকা নিয়েছেন, ১ হাজার ৯০০ টাকা নয়। সুমন ও রাসেলও ভূমি অফিসে জমিসংক্রান্ত কাজ করেন বলে দাবি করেন তিনি।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
লালবাগ রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আমিনুল ইসলাম প্রথমে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো প্রশ্নের উত্তর দেননি। পরে লিখিত বার্তায় তিনি জানান, তাঁর কার্যালয়ে কোনো ওমেদার নেই।
কোনো কর্মীর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ থাকলে লিখিত আবেদন করা যাবে জানিয়ে তিনি বলেন, সিসি ক্যামেরার ফুটেজসহ উপযুক্ত প্রমাণ ও লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।