৩৬ বছর লাশ কাটা সুধীরের আক্ষেপ: ‘দোকানে চা খেতে গেলেও মানুষ উঠে যায়’

আপলোড সময় : ২৪-১০-২০২৬ ১১:১০:১২ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ২৪-১০-২০২৬ ১১:১০:১২ পূর্বাহ্ন

বাগেরহাট ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে দীর্ঘ ৩৬ বছর ধরে ময়নাতদন্তের কাজে যুক্ত সুধীর কুমার ডোম। বংশপরম্পরায় পাওয়া এ পেশায় জীবনের বড় একটি সময় কাটিয়েছেন তিনি। বয়সের ভারে এখন আর একা সব কাজ সামলাতে পারেন না। তাই বাবাকে সহযোগিতা করতে পাশে দাঁড়িয়েছেন তাঁর দুই ছেলে আশিক ও অন্তর। তবে দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ এ কাজে সহযোগিতা করলেও তাঁদের কোনো সরকারি বেতন বা ভাতা নেই। সুধীরের এখন একটাই আকুতি—তাঁর অবর্তমানে যেন দুই ছেলের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়।

সুধীর কুমারের বাড়ি বাগেরহাট শহরের লিচুতলা এলাকায়। তাঁর পরিবারে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ময়নাতদন্তের কাজ চলে আসছে। দাদা ও বাবার কাছ থেকে এ পেশার সঙ্গে পরিচয়, পরে বাবার কাছেই কাজ শেখেন সুধীর। এরপর নিজেই বাগেরহাট সদর হাসপাতালে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে ৩৬ বছর। তাঁর দাবি, দীর্ঘ কর্মজীবনে প্রায় ছয় থেকে সাত হাজার মরদেহের ময়নাতদন্তের কাজে যুক্ত ছিলেন তিনি।

সুধীরের তিন ছেলে—বড় ছেলে আশিক, মেজো ছেলে স্যান্ডি এবং ছোট ছেলে অন্তর। তাঁদের মধ্যে আশিক ও অন্তর দীর্ঘদিন ধরে বাবাকে কাজে সহযোগিতা করছেন। মরদেহ বহন, ওঠানো-নামানো, ফ্রিজে সংরক্ষণসহ বিভিন্ন কাজে তাঁদের যুক্ত থাকতে হয়। বয়স বেড়ে যাওয়ায় এখন এসব কাজ একা সামলানো সুধীরের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

সুধীর কুমার ডোম বলেন, ‘জীবনের প্রথম যখন লাশ কাটার কাজ শুরু করি, তখন মনের মধ্যে ভয় ছিল। ধীরে ধীরে সেই ভয় কেটে গেছে। এখন অভিজ্ঞতা দিয়ে অনেক কিছু করতে পারি। কিন্তু বয়স হয়েছে, আগের মতো আর পারি না। একা মরদেহ বহন, ওঠানো-নামানো ও ফ্রিজে সংরক্ষণের কাজ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই দুই ছেলে আমাকে সাহায্য করে। সরকার থেকে শুধু আমি বেতন পাই, আমার ছেলেরা কোনো বেতন পায় না।’

পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সামাজিক অবহেলার অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন সুধীর। তাঁর ভাষ্য, ডোম পরিচয়ের কারণে অনেকেই তাঁদের ভালো চোখে দেখেন না। কোথাও চা খেতে গেলে কেউ কেউ উঠে চলে যান। অথচ মৃত্যুর পর মানুষের মরদেহের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন তাঁরা। তারপরও এ পেশার মানুষের প্রতি সমাজের একাংশের দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়নি বলে আক্ষেপ তাঁর।

সুধীরের কাজ শুধু নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দুর্ঘটনা বা অপমৃত্যুর ঘটনায় যেকোনো সময় হাসপাতালে ছুটে আসতে হয় তাঁকে। এমনকি পূজার দিনেও মরদেহ আসার খবর পেয়ে কাজে যোগ দিতে হয়েছে বলে জানান তিনি। তাঁর অভিযোগ, অন্যরা ছুটি পেলেও তাঁদের জন্য ছুটি পাওয়া কঠিন।

সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তা নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে নয়, দুই ছেলের কর্মসংস্থান নিয়ে। চাকরি শেষ হলে কিংবা তিনি মারা গেলে ছেলেরা কীভাবে চলবেন, তা ভেবে উদ্বিগ্ন সুধীর।

তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেদের মা নেই। আমি মারা গেলে বা চাকরি শেষ হয়ে গেলে ওরা অসহায় হয়ে পড়বে। ওরা দীর্ঘদিন ধরে আমার সঙ্গে কাজ করছে। সরকারের কাছে আমার একটাই দাবি, আমার চাকরির পর যেন আমার ছেলেরা এখানে চাকরি করে খেতে পারে।’

বড় ছেলে আশিক বলেন, ‘আমি আর আমার ছোট ভাই দীর্ঘদিন ধরে বাবার সঙ্গে কাজ করছি। বাবা একা সবকিছু করতে পারেন না। মরদেহ ওঠানো-নামানো থেকে শুরু করে অন্যান্য কাজেও আমাদের থাকতে হয়। কিন্তু সরকার থেকে আমরা কোনো বেতন পাই না। আমরা চাই, বাবার অবসরের পর যেন আমরা দুই ভাই এই হাসপাতালে সরকারি চাকরি পাই।’

নিজেদের পেশাগত পরিচয়ের কারণে সামাজিকভাবে অবহেলার শিকার হওয়ার আশঙ্কার কথাও জানান আশিক। তাঁর ভাষ্য, অন্য কাজ করলেও মানুষ তাঁদের গ্রহণ করবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই, সরকারিভাবে চাকরি করে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকতে।’

ছোট ছেলে অন্তর জানান, বাবার বয়স বেড়ে যাওয়ায় একা মরদেহ ওঠানো-নামানো, ফ্রিজে সংরক্ষণ এবং ময়নাতদন্তের কাজে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। হাসপাতালের উঁচু তলা থেকে মরদেহ নিচে নামানোর মতো কাজেও তাঁকে সহায়তা করতে হয়।

অন্তর বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে বাবার সঙ্গে কাজ করছি। বাবা বেতন পেলেও আমরা কোনো টাকা পাই না। আমাদের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বাবার যদি কোনো বিপদ হয়, তাহলে এই কাজ কে করবে? সরকারের কাছে আমাদের আবেদন, আমাদের দুই ভাইকে যেন এই হাসপাতালে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাহলে আমরা ভালোভাবে খেয়ে-পরে বাঁচতে পারব।’

স্থানীয় বাসিন্দা জামাল হোসেন বলেন, ডোমের কাজ সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এ পেশার মানুষকে অনেক সময় অবহেলার শিকার হতে হয়। চায়ের দোকান কিংবা অন্য কোথাও খেতে বসলে কেউ কেউ তাঁদের দেখে উঠে চলে যান। অথচ তাঁরাও সমাজের অন্য সবার মতো মানুষ। তাঁদের ঘৃণার চোখে না দেখে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করা উচিত। পাশাপাশি সরকারেরও তাঁদের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন।

এ বিষয়ে বাগেরহাট ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. অসীম কুমার সমাদ্দার বলেন, ময়নাতদন্ত হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম এবং এ কাজে নিয়োজিত কর্মীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সরকারি নিয়োগ নির্দিষ্ট বিধিবিধান ও প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। সুধীর কুমার ডোমের দুই ছেলের চাকরির দাবির বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনা যেতে পারে। তাঁদের নিয়োগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার যথাযথ কর্তৃপক্ষের।

সম্পাদকীয় :

সম্পাদক: শাকিলা জাহান
মোবাইল: ০১৩০১১০৪০৭০ ই-মেইল: info@gbanglanews.com

অফিস :

জি.এম বাংলা লিমিটেডের একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান।

৫৬-৫৭, শরীফ ম্যানশন, মতিঝিল রোড, ঢাকা-১০০০