চুয়াডাঙ্গার বাজারে চাল ও ডালের দাম বাড়ায় চাপে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা। গত এক মাসে বিভিন্ন ধরনের মাছের দাম কেজিতে ৫০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত কমেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তবে ডালের কেজিতে সর্বোচ্চ ২০ টাকা এবং চালের ২৫ কেজির বস্তায় ৫০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে মুরগি, মসলা ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের ওঠানামায় সংসারের খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন নিম্ন আয়ের মানুষ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরা। আয় না বাড়লেও বাজার খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই কমিয়ে দিচ্ছেন কেনাকাটার পরিমাণ।
চুয়াডাঙ্গা শহরের বড় বাজারে গত দুই দিন ঘুরে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাজারে সব পণ্যের দাম একই দিকে যাচ্ছে না। কিছু মাছ ও সবজির দাম কমলেও চাল-ডাল এবং মুরগির কয়েকটি জাতের দাম বেড়েছে। ফলে কোনো কোনো পণ্যের দাম কমার স্বস্তি অন্য পণ্যের বাড়তি দামের চাপে ম্লান হয়ে যাচ্ছে।
বাজারে আসা ক্রেতাদের অভিযোগ, আগে যে পরিমাণ টাকা নিয়ে বাজারে এসে চাল, ডালসহ প্রয়োজনীয় পণ্য কেনা যেত, এখন একই টাকায় আগের সমপরিমাণ পণ্য পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে প্রয়োজনীয় জিনিসের তালিকা ছোট করতে হচ্ছে। অনেক পরিবার কম পরিমাণে পণ্য কিনে কোনোভাবে সংসার চালাচ্ছে।
কেজিতে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে ডালের দাম
চুয়াডাঙ্গার বড় বাজারের মুদি ব্যবসায়ী হাসানুজ্জামান হাসান বলেন, কয়েক ধরনের ডালের দাম হঠাৎ বেড়েছে। আগে প্রতি কেজি মুগের ডাল ১৫০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে তা ১৭০ টাকা। কলাইয়ের ডাল ১৬০ টাকা থেকে বেড়ে ১৮০ টাকা হয়েছে। ভালো মানের মসুর ডালের দাম ১৩০ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫০ টাকায়। একইভাবে ছোলার ডাল ১০০ টাকা থেকে বেড়ে ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
তিনি বলেন, শুধু ডাল নয়, মসলা থেকে শুরু করে শিশুদের দুধসহ অধিকাংশ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এতে ক্রেতা ও বিক্রেতা—উভয় পক্ষই সমস্যায় পড়ছেন। ক্রেতারা আগের দামের হিসাব করে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা নিয়ে বাজারে এলেও দোকানে গিয়ে বাড়তি দাম দেখে প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে পারছেন না। অনেকে কম পরিমাণে পণ্য কিনছেন, আবার কেউ কেউ পণ্য না কিনেই ফিরে যাচ্ছেন।
হাসানুজ্জামান হাসান বলেন, “দ্রব্যমূল্যের এই বৃদ্ধিতে আমরাও যাতাকলে পিষ্ট হচ্ছি। ক্রেতারা প্রয়োজনীয় মালামাল কিনতে এসে টাকার অভাবে ফিরে যাচ্ছেন। এতে আমাদের ব্যবসায়ও ক্ষতি হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, দোকানভাড়া, বিদ্যুৎ বিল ও সংসারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
চালের বস্তাপ্রতি বেড়েছে ৫০ টাকা
বড় বাজারের চাল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চালের দামেও ঊর্ধ্বগতি রয়েছে। ভালো মানের বাসমতি চাল পাইকারিতে কেজিপ্রতি ৭৮ টাকা এবং খুচরা বাজারে ৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ভালো মানের মিনিকেট চালের দাম কেজিতে ৬৬ টাকা। রড মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে ৫৪ টাকা কেজি দরে।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, বিভিন্ন ধরনের চালের ২৫ কেজির বস্তায় ৫০ টাকা করে দাম বেড়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন মসলার দামও ২ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
চাল-ডালের মতো প্রতিদিনের খাবারের অপরিহার্য উপকরণের দাম বাড়ায় সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন সীমিত আয়ের মানুষ। আয়ের বড় অংশ খাবার কেনার পেছনে ব্যয় হওয়ায় সামান্য মূল্যবৃদ্ধিও তাঁদের জন্য বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
আয় বাড়েনি, বেড়েছে সংসার চালানোর খরচ
নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে দিনমজুর ও পরিবহন শ্রমিকদের জীবনেও। রিকশাচালক শাহাজান বলেন, চাল, ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লেও তাঁদের আয় আগের মতোই রয়েছে। বাড়তি খরচ মেটাতে গিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, “দ্রব্যমূল্য বাড়ছে, কিন্তু আমাদের আয় তো বাড়ছে না। তাহলে আমরা কীভাবে চলব? প্রতিদিন যা আয় করি, তা দিয়ে খাবার কিনে পরিবারের অন্য খরচ মেটানোই কঠিন হয়ে যাচ্ছে।”
আরেক রিকশাচালক জালাল উদ্দিন বলেন, ইজিবাইকের কারণে তাঁদের রিকশায় আগের মতো ভাড়া হচ্ছে না। এর মধ্যে চাল, ডাল ও সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে। আয় না বাড়ায় সংসারের খরচ মেটাতে তাঁকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
তাঁদের মতো দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জন্য বাজারের বাড়তি খরচ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে। একদিকে কাজ ও যাত্রী কমে আয় কমছে, অন্যদিকে বাড়ছে খাবারসহ প্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয়।
মুরগির কয়েকটি জাতের দাম বেড়েছে ২০ টাকা
চুয়াডাঙ্গার বড় বাজারের এক মুরগি ব্যবসায়ী বলেন, গত সপ্তাহের তুলনায় ব্রয়লার মুরগির দাম বাড়েনি। তবে লেয়ার, সোনালি ও দেশি মুরগিসহ কয়েক ধরনের মুরগির দাম কেজিতে ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
বাজারে ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে কেজি ২০০ টাকা দরে। সোনালি মুরগির দাম ২০ টাকা বেড়ে ৩২০ টাকা, লেয়ার মুরগির দাম বেড়ে ৩৭০ টাকা এবং পেরেন্স মুরগির দাম বেড়ে ৩৮০ টাকা হয়েছে।
অন্যদিকে, এক মাছ ব্যবসায়ী জানান, গত মাসের তুলনায় বর্তমানে মাছের দামে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। তাঁর দাবি, বিভিন্ন ধরনের মাছের দাম কেজিতে ৫০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। তবে দাম কমার পরও ক্রেতা কম থাকায় ব্যবসায়ীরা প্রত্যাশিত বিক্রি করতে পারছেন না।
বড় বাজারে সবজি ও মসলার দাম
বাজার ঘুরে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আলু বিক্রি হচ্ছে কেজি ২৫ টাকা দরে, যা আগের তুলনায় ৫ টাকা বেশি। পেঁয়াজের দাম কেজিতে ৫০ টাকা। রসুনের দাম ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়ে ৮০ থেকে ৯০ টাকা হয়েছে। অন্যদিকে, আদার দাম কেজিতে ৫০ টাকা কমে ২০০ টাকা হয়েছে।
কাঁচা মরিচ বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে। টমেটোর দাম কেজিতে ৩০ থেকে ৪০ টাকা কমে ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা হয়েছে। গাজরের দাম ৭০ থেকে ৮০ টাকা কমে ১৬০ টাকা এবং ফুলকপির দাম ৪০ থেকে ৫০ টাকা কমে ৬০ টাকা হয়েছে। তবে বাঁধাকপির দাম ১০ টাকা বেড়ে ৫০ টাকা হয়েছে।
শিমের দাম কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা কমে ১২০ থেকে ১৩০ টাকা হয়েছে। শসা বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ টাকা, বেগুন ৬০ থেকে ৭০ টাকা এবং কাঁচা কলা ৩০ টাকা কেজি দরে।
এ ছাড়া লাউ ২৫ থেকে ৩০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৫০ টাকা, লালশাক ১০ টাকা, ছোলার শাক ১২০ টাকা, পটল ৩০ টাকা, উচ্ছে ৫০ টাকা, ঢ্যাঁড়স ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং ঝিঙে ৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
গরু-খাসির মাংস ও ডিমের দাম
বড় বাজারে গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে কেজি ৮০০ টাকা দরে। খাসির মাংসের দাম কেজিপ্রতি ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা। বাজারে ডিমের খাঁচি বিক্রি হচ্ছে ৩১০ টাকা দরে এবং প্রতি হালি ডিমের দাম ৪৪ টাকা।
চাল, ডাল ও অন্যান্য খাবারের উপকরণের সঙ্গে ডিম ও মাংসের খরচ যোগ হওয়ায় সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর বাজারের বাজেট আরও চাপে পড়ছে।
কমেছে বিভিন্ন ধরনের মাছের দাম
চুয়াডাঙ্গার বড় বাজারে বড় রুই মাছ বিক্রি হচ্ছে কেজি ৫০০ টাকা দরে। আগের তুলনায় দাম ৫০ থেকে ১০০ টাকা কমেছে। ছোট রুইয়ের দাম ২০ থেকে ৫০ টাকা কমে ২৮০ থেকে ৩৫০ টাকা হয়েছে। বড় কাতলার দাম ২০০ থেকে ২৫০ টাকা কমে ৫০০ টাকা এবং ছোট কাতলার দাম ৫০ থেকে ৭০ টাকা কমে ২৮০ টাকা হয়েছে।
গলদা চিংড়ির দাম কেজিতে ১০০ থেকে ২০০ টাকা কমে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা হয়েছে। পাঙাশের দাম ২০ থেকে ৩০ টাকা কমে ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা, সিলভার কার্পের দাম ২০ থেকে ৪০ টাকা কমে ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা এবং ছোট কই মাছের দাম ২০ থেকে ৩০ টাকা কমে ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা হয়েছে।
বাড়তি দামে ছোট হচ্ছে বাজারের তালিকা
চুয়াডাঙ্গার বড় বাজারের সামগ্রিক চিত্রে দেখা যাচ্ছে, কিছু মাছ ও সবজির দাম কমলেও চাল, ডাল, কয়েক ধরনের মুরগি এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দাম সাধারণ মানুষের ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোকে নির্ধারিত বাজেটের মধ্যে খাবার ও সংসারের অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোরও মাসিক খরচের হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে উঠছে।
ক্রেতাদের অভিযোগ, বাজারে এসে পণ্যের দাম শুনে অনেক সময় প্রয়োজনীয় জিনিসের পরিমাণ কমিয়ে দিতে হচ্ছে। আগে যে টাকায় সপ্তাহের বাজার করা যেত, এখন একই টাকায় সব প্রয়োজনীয় পণ্য কেনা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে খাবারের তালিকা থেকে কিছু পণ্য বাদ দেওয়া কিংবা কম পরিমাণে কেনার মাধ্যমে সংসারের খরচ সামলাতে হচ্ছে অনেককে।