মক্কা জোট কি শুধুই কাগুজে? তুরস্ক-পাকিস্তানের নীরবতা ঘিরে বিতর্ক

আপলোড সময় : ১৫-০৯-২০২৬ ১১:০১:১৩ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ১৫-০৯-২০২৬ ১১:০১:১৩ পূর্বাহ্ন

সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের একের পর এক হামলার পরও তুরস্ক ও পাকিস্তানের পক্ষ থেকে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ না আসায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে। গত মাসে তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরব চুক্তিতে সই করার পর থেকেই এর বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

বিশেষ করে সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো ও বেসামরিক এলাকায় হুথিদের হামলার পর প্রশ্ন উঠেছে—চুক্তি অনুযায়ী তুরস্ক ও পাকিস্তান কি রিয়াদের পাশে সামরিকভাবে দাঁড়াবে?

তবে তুরস্কের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলছেন, এখনই মক্কা জোটের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা ঠিক নয়। তার দাবি, চুক্তির পারস্পরিক প্রতিরক্ষা বাধ্যবাধকতা এখনো আইনগতভাবে কার্যকর হয়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা মিডল ইস্ট আইকে বলেন, চুক্তিটি তিন দেশের অভ্যন্তরীণ অনুমোদন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এরপরই এর প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা কার্যকর হবে।

তিনি জানান, তুরস্ক শিগগিরই চুক্তিটি পার্লামেন্টে উপস্থাপন করবে। সম্ভাব্যভাবে অক্টোবরেই এ প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।

পার্লামেন্টের অনুমোদন এখনো বাকি

তুরস্কের সংবিধান অনুযায়ী, পার্লামেন্টের অনুমোদন ছাড়া দেশটির প্রেসিডেন্ট কোনো নিরাপত্তা চুক্তি অনুমোদন করতে পারেন না। পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও পার্লামেন্টের অনুমোদন প্রয়োজন। তবে সৌদি আরব রাজকীয় ডিক্রির মাধ্যমে চুক্তিটি অনুমোদন করতে পারে।

ফলে এখনই তুরস্ককে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের জন্য দায়ী করা আইনগতভাবে সঠিক নয় বলে মনে করেন ওই কর্মকর্তা।

তার ভাষ্য, মক্কা চুক্তি শুধু একটি নিরাপত্তা জোট নয়; এটিকে ভবিষ্যতে একটি আন্তর্জাতিক সংগঠনে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। চুক্তিটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তৈরি করা হয়েছে এবং এর পূর্ণাঙ্গ কাঠামো প্রকাশ হলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে বলেও জানান তিনি।

কার্যকর হওয়ার পরও সময় লাগবে

চুক্তি কার্যকর হওয়ার পরও তিন দেশকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে সম্ভাব্য হুমকি মূল্যায়নের ব্যবস্থা, নিয়মিত পরামর্শ ও সমন্বয়, যৌথ প্রতিরক্ষা ও প্রস্তুতি পরিকল্পনা এবং সামরিক সরঞ্জাম ও বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় বা ইন্টারঅপারেবিলিটি তৈরি।

এর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তোলার বিষয়টিও রয়েছে। তুর্কি কর্মকর্তার মতে, এসব প্রাতিষ্ঠানিক ও সামরিক সক্ষমতা গড়ে তুলতে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

তিন দেশ একসঙ্গে সামরিক মহড়া করেনি

তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরব এর আগে আলাদাভাবে একে অপরের সঙ্গে সামরিক মহড়ায় অংশ নিয়েছে। কিন্তু তিন দেশকে নিয়ে একসঙ্গে কোনো ত্রিপক্ষীয় সামরিক মহড়া এখনো হয়নি।

তাই চুক্তি সই হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিন দেশের বাহিনী একযোগে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলার জবাব দিতে প্রস্তুত—এমনটা ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

তবে জোটের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরির কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। গত ৩১ আগস্ট ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তিন দেশ সৌদি আরবে একটি সচিবালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়। শুরুতে তিন বছরের জন্য একজন পাকিস্তানি মহাসচিব এই দায়িত্ব পালন করবেন।

ন্যাটোর মতো, তবে হামলা হলেই পালটা নয়

মক্কা চুক্তিতে বলা হয়েছে, কোনো একটি সদস্যের ওপর হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এ কারণে চুক্তিটিকে প্রায়ই ন্যাটোর আর্টিকেল ৫-এর সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে।

তুর্কি কর্মকর্তা জানান, চুক্তিটি তৈরির সময় ন্যাটোর চুক্তি থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়া হয়েছে। তবে ন্যাটোর আর্টিকেল ৫-এর ক্ষেত্রেও কোনো সদস্য আক্রান্ত হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সামরিক পালটা হামলা চালানোর বাধ্যবাধকতা নেই।

বরং আক্রান্ত দেশ সহযোগিতা চাইলে সদস্যরা আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নির্ধারণ করবে। অর্থাৎ, কোনো সদস্য আক্রান্ত হলেই সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হবে—মক্কা চুক্তিতে এমন স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা নেই।

সৌদির পাশে রাজনৈতিক সমর্থন তুরস্ক-পাকিস্তানের

সৌদি আরবের ওপর সাম্প্রতিক হুথি হামলার পর তুরস্ক ও পাকিস্তান রাজনৈতিকভাবে রিয়াদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।

পাকিস্তান জানিয়েছে, সৌদির সঙ্গে তাদের আলাদা একটি বাধ্যতামূলক দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি থাকলেও রিয়াদ এখনো তাদের সামরিক হস্তক্ষেপের অনুরোধ জানায়নি।

অন্যদিকে, তুর্কি কর্মকর্তাও প্রশ্ন তুলেছেন, অতীতে ন্যাটোর সদস্যদের আকাশসীমায় রুশ ড্রোন প্রবেশের ঘটনায় জোট সবসময় সামরিক পালটা ব্যবস্থা নিয়েছে কি না।

তার মতে, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির মূল উদ্দেশ্য কোনো একটি হামলার তাৎক্ষণিক জবাব দেওয়া নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদে এমন একটি প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করা, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলার ঝুঁকি কমে।

তিনি স্বীকার করেন, সৌদি আরবের ওপর হুথিদের হামলা এবং ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের সম্ভাবনা এই জোটের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

তবে তার দাবি, চুক্তিটি করা হয়েছে দীর্ঘমেয়াদে তিন দেশের মধ্যে একটি সমন্বিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে। এর মাধ্যমে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানো এবং সম্ভাব্য হামলা ঠেকাতে কার্যকর প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব হবে।

সম্পাদকীয় :

সম্পাদক: শাকিলা জাহান
মোবাইল: ০১৩০১১০৪০৭০ ই-মেইল: info@gbanglanews.com

অফিস :

জি.এম বাংলা লিমিটেডের একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান।

৫৬-৫৭, শরীফ ম্যানশন, মতিঝিল রোড, ঢাকা-১০০০