উন্নয়ন প্রকল্পে জনগণের অর্থের অপচয় বন্ধ করে কম ব্যয়ে সর্বোচ্চ সুফল নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান।
শনিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ নির্দেশ দেন।
এলজিইডির প্রকৌশলীদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, ১০ কোটি টাকার কাজ কীভাবে সাত থেকে আট কোটি টাকার মধ্যে করা যায়, সেই চেষ্টা করতে হবে। একই সঙ্গে প্রকল্পের যথাযথ পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারি কর্মকর্তাদের জনগণের সম্পদের রক্ষক উল্লেখ করে আবদুল মঈন খান বলেন, জনগণ যে দায়িত্ব দিয়েছে, তার অংশ হিসেবে রাষ্ট্রীয় সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। দেশের সম্পদ সীমিত। তাই প্রয়োজন ও সক্ষমতার মধ্যে সমন্বয় করে উন্নয়নকাজ করতে হবে। জনগণের প্রয়োজন ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
পরিকল্পনার চেয়ে বাস্তবায়ন বেশি গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘বাস্তবায়ন না হলে কাগজে-কলমে যত কিছুই লেখা হোক না কেন, কোনো ফল পাওয়া যাবে না।’ সভায় উঠে আসা বিষয়গুলো নোট করে নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে বাস্তবায়নের জন্য কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, দেশের গ্রামীণ অবকাঠামো ও জনপদের উন্নয়নের চাবিকাঠি এলজিইডির প্রায় পাঁচ হাজার ৬০০ কর্মকর্তার হাতে। তবে শুধু চাবি হাতে থাকলেই হবে না, সেটি সঠিক দিকে ঘোরাতে হবে। সঠিক সিদ্ধান্ত দেশের উন্নয়ন এগিয়ে নেবে, আর ভুল সিদ্ধান্ত উন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টি করবে।
কর্মকর্তাদের কাজে প্রেরণার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, জনগণের সেবা করার জন্য কাজ করছেন—এ বিশ্বাস থাকলে দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা সম্ভব হবে। দেশের কোটি কোটি মানুষ এখনো কষ্টে আছে। তাদের কথা ও দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে সবাইকে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
এলজিইডি ও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন আবদুল মঈন খান। তিনি বলেন, প্রায় ৩৫ বছর আগে খালেদা জিয়া এলজিইডির গুরুত্ব অনুধাবন করেছিলেন। ওই সময় নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্তের ফলে দেশের গ্রামীণ অবকাঠামোয় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমানে নেওয়া উন্নয়ন পরিকল্পনার সুফল আগামী ২০ থেকে ৩০ বছর দেশের মানুষ পাবে বলে আশা প্রকাশ করেন মন্ত্রী। তৃণমূলের মানুষের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
ছোট সড়কে ব্লক ব্যবহারের নির্দেশ
সভায় স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম গ্রামের ছয় থেকে নয় ফুট প্রশস্ত ছোট সড়ক নির্মাণে ইটের পরিবর্তে ইউনি ব্লক ও সিসি ব্লক ব্যবহারের নির্দেশ দেন। উপজেলা পরিষদের রাজস্ব তহবিল, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ও হাটবাজার উন্নয়ন তহবিলের আওতায় নির্মিত ছোট সড়কের ক্ষেত্রে এ নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।
এ বিষয়ে মাঠপর্যায়ে চিঠি দিতে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীকে নির্দেশ দেন প্রতিমন্ত্রী।
মীর শাহে আলম বলেন, কাঠ পুড়িয়ে ইট তৈরি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। পাশাপাশি কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি ব্যবহার করায় জমির উর্বরতা ও উৎপাদনক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব বিবেচনায় ইটের ব্যবহার কমিয়ে ইউনি ব্লক, সিসি ব্লক ও পাথরের ব্যবহার বাড়াতে হবে।
ভারী যানবাহন চলাচলকারী সড়কে ইউনি ব্লক ব্যবহারের আগে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন বলেও জানান তিনি। এ ধরনের সড়কে প্রয়োজন অনুযায়ী পাথর ঢালাই, আরসিসি অথবা কার্পেটিংয়ের মাধ্যমে কাজ করার পরামর্শ দেন তিনি।
বন্যাপ্রবণ সড়কে ‘বিন্না ঘাস’
নদীতীরবর্তী ও বন্যাপ্রবণ সড়কের মাটি ক্ষয় রোধে ‘বিন্না ঘাস’ ব্যবহারের নির্দেশ দেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী। যেসব সড়কে পানির ঢেউ বা বন্যার পানিতে মাটি ক্ষয়ের আশঙ্কা রয়েছে, সেসব স্থানে এই ঘাস ব্যবহারের কথা বলেন তিনি।
তবে সড়কের পাশে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি থাকায় সব জায়গায় ব্যাপকভাবে বিন্না ঘাস ব্যবহার করা যাবে না বলেও জানান তিনি।
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে সৌরবিদ্যুৎ
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোরও নির্দেশ দেন মীর শাহে আলম। তিনি বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও হাটবাজারে সৌর প্যানেল স্থাপন করতে হবে। নিজস্ব চাহিদা পূরণের পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা গেলে বিদ্যুৎ ব্যয় কমবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়ও বাড়বে।
এক ঘণ্টার ব্যাকআপসহ ৫ দশমিক ৫ কিলোওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে সর্বোচ্চ প্রায় ৩ লাখ ২৫ থেকে ২৬ হাজার টাকা ব্যয় হওয়ার কথা উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রতিটি কমপ্লেক্সের জন্য সাড়ে তিন লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও নেট মিটারিংয়ের সুযোগ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
সভায় স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহীদুল হাসান বিশেষ অতিথি ছিলেন। সভাপতিত্ব করেন এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেন। মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী, এলজিইডির চলমান প্রকল্পগুলোর প্রকল্প পরিচালক এবং ৫০৩ উপজেলার প্রকৌশলীরা সভায় অংশ নেন।