বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের প্রায় এক-চতুর্থাংশই রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকে। এসব ব্যাংকে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জনতা ব্যাংকে সবচেয়ে বেশি ৭৫ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ রয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে অগ্রণী ব্যাংকে ২৯ হাজার ২৯ কোটি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে (বিডিবিএল) প্রায় ৮৮৯ কোটি, বেসিক ব্যাংকে ৮ হাজার ১৩১ কোটি, জনতা ব্যাংকে ৭৫ হাজার ৩৯৬ কোটি, রূপালী ব্যাংকে ১৯ হাজার ২৮১ কোটি এবং সোনালী ব্যাংকে ১৫ হাজার ৪৮ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ রয়েছে।
পরিস্থিতি উত্তরণে নগদ আদায় বাড়ানো, ঋণের গুণগত মান যাচাই, আমানত বৃদ্ধি এবং ব্যাংকগুলোর মূলধন পরিস্থিতির উন্নতির নির্দেশ দিয়েছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠকে এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়।
বৈঠকে শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির তালিকা তৈরির পাশাপাশি আগামী ১২ থেকে ২৪ মাসের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঋণ আদায়ে নগদ অর্থ সংগ্রহের পাশাপাশি বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা এবং জামানত আদায়ের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তবে বড় ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ আদায় এবং ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিশ্চিত করতে সরকার কতটা কঠোর হতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী মনে করেন, এ ক্ষেত্রে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার থাকলে ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে ব্যাংকগুলোর সংকট অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। তাঁর মতে, ব্যাংক পুনরুদ্ধার ও ঘুরে দাঁড় করাতে সরকারের দৃঢ় পদক্ষেপ প্রয়োজন।
ঋণ আদায়ের বিষয়ে ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, নগদ অর্থ আদায় করা কঠিন হলেও এটি ঋণ পুনরুদ্ধারের সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি। অন্যদিকে জামানত বিক্রি করে অর্থ আদায় করতে গেলে আইনি প্রক্রিয়ায় যেতে হয়, যা দীর্ঘায়িত হতে পারে।
এদিকে কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে উচ্চ খেলাপি ঋণের বিপরীতে বড় ধরনের প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতি তৈরি হয়েছে। প্রয়োজন হলে এসব ব্যাংককে সরকার মূলধন সহায়তা দেবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তবে এর শর্ত হিসেবে ঋণ আদায় বাড়িয়ে ঘাটতি পূরণ এবং ব্যাংকগুলোকে লাভজনক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ব্যাংক খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি সহায়তার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে ঋণ অনুমোদন ও ব্যবস্থাপনায় সুশাসন জোরদার না করলে খেলাপি ঋণের সমস্যা দীর্ঘমেয়াদে কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে আমানত বাড়াতে ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানো এবং গ্রাহকদের জন্য নতুন সেবা চালুর মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর আমানতভিত্তি শক্তিশালী করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।