সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের শ্রীপুর-কুড়িকাহুনিয়া এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বেড়িবাঁধে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। সোমবার ভোর থেকে শুরু হওয়া ভাঙনে প্রায় ৫০ মিটার বাঁধ নদী-খালের দিকে ধসে পড়েছে। একই সঙ্গে ওয়াপদা সড়কের একটি অংশও ভেঙে যাওয়ায় ওই পথে চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
দ্রুত ভাঙন রোধ করা না গেলে প্রতাপনগর ও পার্শ্ববর্তী আনুলিয়া ইউনিয়নের ১০ থেকে ১২টি গ্রাম প্লাবিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। এতে বসতবাড়ি, ফসলি জমি ও হাজার হাজার মৎস্যঘের পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় আতঙ্কে রয়েছেন তারা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সোমবার ভোর ৩টার দিকে কুড়িকাহুনিয়া লঞ্চঘাটের দক্ষিণ পাশে বেড়িবাঁধে ভাঙনের সূত্রপাত হয়। সকাল ৭টার দিকে ভাঙন বড় আকার ধারণ করে। একপর্যায়ে বাঁধের প্রায় ৫০ মিটার অংশ ধসে নদী-খালের দিকে চলে যায়। ভাঙনের মুখে থাকা বাঁধের আরও কিছু অংশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
ভাঙনের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সকাল থেকেই স্থানীয় বাসিন্দারা ঘটনাস্থলে জড়ো হন। সরকারি সহায়তার অপেক্ষা না করে স্বেচ্ছাশ্রমে বালি ও মাটি ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা শুরু করেন তারা। বাঁধের দুর্বল অংশে বস্তা ফেলা ও মাটি দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার কাজ চলছে।
স্থানীয় বাসিন্দা রবিউল ইসলাম বলেন, ‘সারা বছর আমাদের নদীর সঙ্গে যুদ্ধ করে বাঁচতে হয়। সব সময় ভয় থাকে, কখন ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়ে যায়। সবে এলাকায় গাছপালা ও ফসল হচ্ছে। আবার যদি পানি ঢুকে পড়ে, তাহলে সব শেষ হয়ে যাবে। হাজার হাজার মৎস্যঘের পানিতে ভেসে যাবে।’
তিনি অভিযোগ করেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড আগে থেকেই কার্যকর ব্যবস্থা নিলে এভাবে আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হতো না।
স্থানীয় বাসিন্দা নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, সকাল থেকেই স্থানীয় জনগণকে নিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভাঙন মোকাবিলায় কাজ করছেন তারা। দ্রুত বালি ফেলে ভাঙনস্থল মেরামত করা না হলে ভাঙন আরও বিস্তৃত হতে পারে।
পাউবোর বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ভাঙন শুরু হওয়ার পর সাধারণত পানি উন্নয়ন বোর্ড কাজ শুরু করে। কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে আগে থেকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। ভাঙনস্থলের সামনেই খাল থাকায় বাঁধটি পুরোপুরি ভেঙে গেলে প্রতাপনগরের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী আনুলিয়া ইউনিয়নও প্লাবিত হতে পারে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতাপনগর এলাকার মানুষের কাছে বেড়িবাঁধে ভাঙন নতুন কোনো ঘটনা নয়। নদী ও জোয়ারের পানির সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে টিকে থাকতে হয় তাদের। বাঁধের কোনো অংশে দুর্বলতা দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়ায় পরে তা বড় ভাঙনে রূপ নেয়। এবারও দ্রুত স্থায়ী ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
এদিকে ভাঙনস্থলের পাশ দিয়ে যাওয়া ওয়াপদা সড়কের একটি অংশও ধসে পড়েছে। ফলে ওই পথে যানবাহন ও সাধারণ মানুষের চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। ভাঙন আরও বাড়লে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শ্যামানন্দ কুণ্ডু বলেন, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় চেয়ারম্যানকে প্রাথমিকভাবে কাজ শুরু করার জন্য জানানো হয়েছে। পাশাপাশি পানি উন্নয়ন বোর্ডকেও বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে। তারা দ্রুত কাজ শুরু করবে।
সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুর রহমান তাযকিয়া বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শনের জন্য রওনা হয়েছি। আনুমানিক ৫০ মিটারের মতো বেড়িবাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। খুব দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।’
তবে স্থানীয়দের আশঙ্কা, শুধু বালি ও মাটি ফেলে সাময়িকভাবে ভাঙন ঠেকানো হলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। তাদের দাবি, জরুরি ভিত্তিতে ভাঙনস্থলে প্রতিরোধকাজের পাশাপাশি পুরো ঝুঁকিপূর্ণ অংশ পরীক্ষা করে স্থায়ী সংস্কার করতে হবে।
স্থানীয়দের স্বেচ্ছাশ্রমে ভাঙন প্রতিরোধের কাজ চললেও বাঁধের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা কাটেনি। জোয়ারের পানির চাপ বাড়লে দুর্বল অংশটি আরও ধসে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।