শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ বিভিন্ন দাবিতে চলমান শিক্ষার্থীদের আন্দোলন প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, কিছু মহল নিজেদের পরিচয় গোপন করে পরিস্থিতিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। তার ভাষায়, ‘ঘোলা পানিতে কেউ কেউ মাছ শিকার করতে চায়।’
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) দুপুরে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ মন্তব্য করেন।
এক প্রশ্নের জবাবে আন্দোলনের পেছনে কোনো সংগঠন বা গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের উত্তরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘পেছনে যেই থাকুক, সামনে আমরা আছি।’
তিনি বলেন, সরকারকে বিব্রত করতে চায়—এমন কিছু মহল বিভিন্ন ইস্যুতে নিজেদের পরিচয় গোপন করে পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করে। আন্দোলনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে এমন অনেকে রয়েছেন, যারা শিক্ষার্থী বা পরীক্ষার্থী নন বলেও দাবি করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শিক্ষার্থীরা তাদের দাবি সরকার ও শিক্ষামন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও এ বিষয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। শিক্ষামন্ত্রী তার মন্তব্যের জন্য ইতোমধ্যে দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং পরীক্ষার্থীদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট তিনটি বিষয়ের পরীক্ষা পুনরায় নেওয়ার ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে আর কিছু বলার নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আরেক প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আন্দোলনের বিস্তৃতি খুব বেশি নয়। সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকাসহ কয়েকটি জেলার সীমিত কিছু স্থানে বিক্ষোভ হয়েছে। তবে গণমাধ্যমে প্রচারের কারণে বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় সচিবালয়ে গিয়ে পরীক্ষা স্থগিত বা বিনা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার মতো প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। সেই ধারা এখনও কিছু ক্ষেত্রে অব্যাহত রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে শিক্ষার মান ক্ষুণ্ন হয়—এমন কোনো সিদ্ধান্ত সরকার গ্রহণ করবে না বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
পরীক্ষা নিয়ে আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
রোববার দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভারি বর্ষণ ও জলাবদ্ধতার কারণে এইচএসসির পদার্থবিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান ও যুক্তিবিদ্যা প্রথম পত্রের পরীক্ষা স্থগিতের দাবি ওঠে। তবে চট্টগ্রাম বিভাগ ছাড়া দেশের অন্যান্য এলাকায় নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।
এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিওতে শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলনের একটি মন্তব্য নিয়ে সমালোচনার সৃষ্টি হয়। ওই অডিওতে পরীক্ষার্থীদের ‘ফার্মের মুরগি’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। এ ঘটনার পর শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ, পরীক্ষা স্থগিত এবং যেসব পরীক্ষার্থী অংশ নিতে পারেননি তাদের পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার দাবিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা।
পরবর্তীতে জাতীয় সংসদে ওই মন্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন শিক্ষামন্ত্রী। একই সঙ্গে পদার্থবিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান ও যুক্তিবিদ্যা প্রথম পত্রের পরীক্ষা পুনরায় নেওয়ার ঘোষণা দেন।
বেনজীর আহমেদকে ফেরানোর চেষ্টা
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, দুবাইয়ে গ্রেপ্তার সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ এবং ওসমান হাদি হত্যা মামলায় ভারতে গ্রেপ্তার তিনজনকে দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার আশা করছে সরকার।
কলেমাখচিত পতাকা ও উগ্রবাদ
দেশের বিভিন্ন স্থানে কলেমাখচিত পতাকা নিয়ে মিছিলের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করে কিছু ব্যক্তি এমন কর্মকাণ্ড চালানোর চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, কিছু উগ্রপন্থি (এক্সট্রিমিস্ট) গোষ্ঠীর তৎপরতা থাকলেও দেশে কোনো সক্রিয় জঙ্গি সংগঠনের অস্তিত্ব সরকার দেখছে না।
মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’
মাদক নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সরকার মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে রয়েছে। নতুন আইন কার্যকর হয়েছে এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে আরও শক্তিশালী করতে অস্ত্র ও ডগ স্কোয়াডসহ প্রয়োজনীয় সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
জুলাই আন্দোলনের হতাহত ও মামলা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই আন্দোলনে আহতের সংখ্যা দুই হাজারের বেশি হতে পারে। তার দাবি, তৎকালীন সরকারের শেষ সময়ে হাসপাতালের নথি গায়েব করা, চিকিৎসা না দেওয়া, লাশ গুম বা বেওয়ারিশ হিসেবে দাফনের মতো ঘটনা ঘটেছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষার কাজ চলছে।
জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া কথিত ভুয়া মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় অভিযোগের ভিত্তিতে অনেক মামলা হয়েছে। বর্তমানে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং নির্দোষ ব্যক্তিদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে। মিথ্যা মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী আদালত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলেও জানান তিনি।
স্টাফ রিপোর্টার