ভিসা জালিয়াতির মাধ্যমে প্রকৃত পাসপোর্টধারীর পরিবর্তে অন্য নারীকে ইতালিতে পাঠানো এবং বিদেশে নেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে একটি সংঘবদ্ধ মানবপাচার চক্রের সাত সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
সোমবার (২১ জুলাই) সিআইডির পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
সিআইডি জানায়, গত ২০ জুলাই রাজধানীর গুলশান-১ এলাকায় অভিযান চালিয়ে চক্রটির সদস্যদের গ্রেফতার করা হয়। এ ঘটনায় গুলশান থানায় মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬ এবং দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
গ্রেফতারকৃতরা হলেন—মো. বেলায়েত হোসেন (৪০), নাজমুল হাসান (১৯), মেহেদী হাসান (৩৭), মো. সোলাইমান সুমন (৩২), ফজলে রাব্বী (২৭), মো. তৌহিদুর রহমান (২৪) এবং কাওসার হোসেন (৪২)।
অভিযানের সময় তাদের অফিস থেকে তিনটি সিপিইউ, একটি এইচপি ল্যাপটপ, বিভিন্ন ব্যক্তির নামে থাকা ৫৬টি পাসপোর্ট, সরকারি-বেসরকারি ও বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির নামে ব্যবহৃত ১৫৩টি সিল, একটি লোহার এম্বোস সিল এবং নগদ ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা জব্দ করা হয়।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী এক নারীর স্বামী দীর্ঘদিন ধরে ইতালিতে বসবাস করছেন। স্বামী ও সন্তানদের সঙ্গে ইতালিতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি ইতালির দূতাবাসে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও পাসপোর্ট জমা দেন। পরে পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হলে নবায়নের জন্য দূতাবাসে গেলে অভিযুক্ত নাজমুল হাসানের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। নাজমুল নিজেকে ভিসা ও পাসপোর্ট সংক্রান্ত কাজের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পরিচয় দিয়ে তাকে গুলশানের একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে নিয়ে যান। সেখানে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান বেলায়েত হোসেনসহ অন্যরা ইতালির ভিসা পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তার সঙ্গে আর্থিক চুক্তি করেন।
পরবর্তীতে অভিযুক্তরা বিভিন্ন সময়ে ভুক্তভোগীর কাছ থেকে মোট ৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা আদায় করে এবং কিছু সময়ের জন্য তার পাসপোর্ট নিজেদের কাছে রেখে দেয়।
পরে ভুক্তভোগীর স্বামী বাংলাদেশ থেকে স্ত্রী ও সন্তানদের ইতালিতে নেওয়ার জন্য বিমান টিকিটের ব্যবস্থা করেন। নির্ধারিত দিনে বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়ার সময় ভুক্তভোগী জানতে পারেন, তার পাসপোর্টে থাকা ইতালির ভিসা ব্যবহার করে ২৪ এপ্রিল ২০২৬ তারিখেই অন্য এক নারী ইতালি চলে গেছেন। তখনই তিনি প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারেন এবং ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের পরামর্শে সিআইডির মানবপাচার শাখায় অভিযোগ করেন।
অভিযোগের পর তদন্ত শুরু করে সিআইডি। প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর অভিযান চালিয়ে চক্রটির সাত সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়।
তদন্তে সিআইডি জানতে পেরেছে, চক্রটি বিদেশে যাওয়ার আগ্রহী ব্যক্তিদের টার্গেট করে ইতালির ভিসার প্রলোভন দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করত। পরে তাদের পাসপোর্ট নিজেদের হেফাজতে রেখে জালিয়াতির মাধ্যমে প্রকৃত পাসপোর্টধারীর পরিবর্তে অন্য ব্যক্তিকে বিদেশে পাঠানোর মতো গুরুতর অপরাধ সংঘটিত করত।
এছাড়া জব্দ করা ৫৬টি পাসপোর্ট ও ১৫৩টি সিল থেকে ধারণা করা হচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে ভিসা জালিয়াতি ও মানবপাচারের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল এই চক্র।
সিআইডির প্রাথমিক তদন্তে আরও জানা গেছে, চক্রটির মূলহোতা বেলায়েত হোসেন ২০১৬ সাল থেকে একই কৌশলে অন্তত ৩০ জনকে ইতালিতে পাঠানোর সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং প্রত্যেকের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়েছেন। একই ধরনের অপরাধের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ২০২৪ সালে বিমানবন্দর থানায় দায়ের হওয়া একটি মামলাও বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
বর্তমানে মামলার তদন্ত চলছে। জব্দ করা পাসপোর্ট, সিল, কম্পিউটারসহ অন্যান্য আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষা, অভিযুক্তদের আর্থিক লেনদেন এবং দেশি-বিদেশি সহযোগীদের শনাক্তে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে সিআইডি।
এদিকে বিদেশে কর্মসংস্থান, অভিবাসন বা ভ্রমণের ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে পাসপোর্ট বা অর্থ হস্তান্তর না করার আহ্বান জানিয়েছে সিআইডি। একই সঙ্গে বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে সরকার অনুমোদিত বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ এবং ভিসা জালিয়াতি বা মানবপাচারের সন্দেহ হলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা সিআইডিকে জানাতে অনুরোধ করা হয়েছে।
স্টাফ রিপোর্টার