বিশ্বে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হৃদরোগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ বা হৃদযন্ত্র ও রক্তনালির রোগ বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর প্রধান কারণ। ২০২২ সালে আনুমানিক ১ কোটি ৯৮ লাখ মানুষ হৃদ্রোগজনিত কারণে মারা যান, যা বিশ্বব্যাপী মোট মৃত্যুর প্রায় ৩২ শতাংশ। এর মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশ মৃত্যু হয়েছে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের কারণে।
তবে জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন এনে হৃদরোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। এর মধ্যে নিয়মিত ফল ও সবজি খাওয়া অন্যতম সহজ ও কার্যকর উপায়। এসব খাবারে ভিটামিন, খনিজ, খাদ্যতন্তু ও প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে, যা হৃদযন্ত্র ও রক্তনালির স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়তা করে।
সম্প্রতি কার্ডিওভাসকুলার ইনোভেশন অ্যান্ড অ্যাপলিকেশন জার্নালে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনামূলক গবেষণায় ফল ও সবজির সঙ্গে হৃদস্বাস্থ্যের সম্পর্কের বিষয়টি উঠে এসেছে।
গবেষণায় কী পাওয়া গেছে?
গবেষকরা ফল ও সবজি হৃদস্বাস্থ্যের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলে, সে বিষয়ে আগে প্রকাশিত বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণার তথ্য পর্যালোচনা করেছেন। এতে দেখা গেছে, যারা তুলনামূলক বেশি ফল ও সবজি খান, তাদের হৃদরোগ, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক এবং উচ্চ রক্তচাপের মতো কার্ডিওভাসকুলার রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কম।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ফল ও সবজি একাধিক উপায়ে হৃদযন্ত্রকে সুরক্ষা দিতে পারে। অর্থাৎ, এগুলো শুধু একটি নির্দিষ্ট ঝুঁকি কমায় না; বরং হৃদরোগের সঙ্গে সম্পর্কিত একাধিক ঝুঁকির কারণ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
কীভাবে হৃদযন্ত্রকে সুরক্ষা দেয়?
ফল ও সবজিতে থাকা বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান হৃদযন্ত্র ও রক্তনালির জন্য উপকারী। এর মধ্যে রয়েছে—
খাদ্যতন্তু বা ফাইবার:
ফাইবার শরীরে খারাপ কোলেস্টেরল বা এলডিএল শোষণ কমাতে সাহায্য করে। পাশাপাশি এটি হজমশক্তি ভালো রাখা এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখতেও সহায়ক।
পটাশিয়াম:
পটাশিয়াম শরীরে সোডিয়ামের ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট:
ভিটামিন সি ও ই, ফ্ল্যাভোনয়েড এবং ক্যারোটিনয়েডের মতো উদ্ভিদজাত উপাদান অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের কারণে রক্তনালির ক্ষতি থেকে শরীরকে সুরক্ষা দিতে পারে।
প্রদাহ কমাতে সহায়ক উপাদান:
দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের সঙ্গে হৃদরোগের সম্পর্ক রয়েছে। ফল ও সবজিতে থাকা বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদান শরীরের প্রদাহ কমাতে সহায়তা করতে পারে।
প্রাকৃতিক নাইট্রেট:
পালং শাক ও বিটরুটের মতো সবুজ শাকসবজিতে প্রাকৃতিক নাইট্রেট থাকে। এগুলো রক্তনালির কার্যকারিতা উন্নত করতে এবং স্বাস্থ্যকর রক্তচাপ বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে।
ফল ও সবজি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক
অনেক ফল ও সবজিতে প্রাকৃতিকভাবে পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়ামসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান রয়েছে। এগুলো রক্তনালি শিথিল করতে এবং রক্তপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে।
অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাবারের পরিমাণ কমিয়ে খাদ্যতালিকায় ফল ও সবজির পরিমাণ বাড়ালে সময়ের সঙ্গে রক্তচাপ আরও স্বাস্থ্যকর পর্যায়ে রাখা সম্ভব হতে পারে।
কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণেও উপকারী
ফল ও সবজিসমৃদ্ধ খাদ্যাভ্যাস কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতেও সহায়তা করতে পারে।
আপেল, কমলা, নাশপাতি এবং ডালজাতীয় খাবারে থাকা দ্রবণীয় ফাইবার খারাপ কোলেস্টেরল বা এলডিএল কমাতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে প্রক্রিয়াজাত খাবার ও অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাটসমৃদ্ধ খাবারের পরিবর্তে তাজা ফল ও সবজি খেলে হৃদস্বাস্থ্যের জন্য আরও উপকার পাওয়া যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা হৃদস্বাস্থ্যের সর্বোচ্চ উপকার পেতে ফল ও সবজির পাশাপাশি পূর্ণ শস্য, বাদাম, ডালজাতীয় খাবার এবং স্বাস্থ্যকর চর্বি খাদ্যতালিকায় রাখার পরামর্শ দেন।
স্টাফ রিপোর্টার